‘পানি লাগবে পানি?’ ১৮ জুলাইয়ে শহীদ মুগ্ধ, দুই বছর পরও অমলিন সেই সাহস

জান্নাতুল মাওয়া, আরটিভি নিউজ  

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ , ১২:৫০ পিএম


‘পানি লাগবে পানি?’ ১৮ জুলাইয়ে শহীদ মুগ্ধ, দুই বছর পরও অমলিন সেই সাহস
‘পানি লাগবে?’ বলেই শহীদ মুগ্ধ, দুই বছর পরও মেলেনি বিচার । ছবি: সংগৃহীত

আজ ১৮ জুলাই, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের শাহাদাতবার্ষিকী। ২০২৪ সালের এই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে খাবার পানি ও বিস্কুট বিতরণ করতে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। তার শেষ উচ্চারণ— ‘পানি লাগবে? কারও পানি লাগবে?’— আজও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবিকতার অন্যতম প্রতীক হয়ে আছে।

মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের জন্ম ১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইলে তার গ্রামের বাড়ি। বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, মা শাহানা চৌধুরী। তিন ভাইয়ের মধ্যে মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধের যমজ ভাই ছিলেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ।

মুগ্ধ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে গণিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ফ্রিল্যান্সিং কাজ করে পরিবারের দায়িত্ব পালন করতেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি ফ্রিল্যান্সিংয়ে এক হাজারের বেশি কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্যও ছিলেন এবং মানুষের সেবামূলক কাজে সব সময় এগিয়ে আসতেন। বানানীর অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি জাতীয় সেবাপদকও পেয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

শেষ মুহূর্তেও মানুষের পাশে

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীজুড়ে সংঘর্ষ চলছিল। ঠিক সেই সময় উত্তরা আজমপুর এলাকায় ক্লান্ত ও আহত আন্দোলনকারীদের হাতে পানি ও বিস্কুট তুলে দিচ্ছিলেন মুগ্ধ। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘পানি লাগবে? কারও পানি লাগবে?’ কিছুক্ষণ পরই মাথায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর মাত্র কয়েক মিনিট আগে ধারণ করা সেই ভিডিও পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুগ্ধের শেষ ডাক ‘পানি লাগবে?’ শুধু একটি বাক্য নয়, মানবতা, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীকে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন দেয়ালে এই বাক্য লেখা হয়, তার স্মরণে বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ পানির কর্নারও স্থাপন করা হয়।

মৃত্যুর আগেই লিখে গিয়েছিলেন স্মরণীয় কথা

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বায়োতে মুগ্ধ লিখেছিলেন—

“একদিন তুমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, তাই এমন জীবন গড়ে তোলো, যা মানুষ আজীবন মনে রাখবে।”

এই কথাগুলো যেন তার নিজের জীবনকেই বাস্তবে তুলে ধরেছে বলে মনে করেন স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

পরিবারের আক্ষেপ, এখনো হয়নি বিচার

মুগ্ধের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তার যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। তার ভাষ্য, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং দ্রুত বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি।

তিনি বলেন, শুধু বিচার নয়, যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই বাংলাদেশও এখনো গড়ে ওঠেনি। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় শহীদ পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

উৎসবেও ফিরে আসে শোক

পরিবার জানায়, মুগ্ধ ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে প্রাণবন্ত সদস্য। ঈদ কিংবা যেকোনো উৎসব তার উপস্থিতিতেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। কিন্তু তার মৃত্যুর পর প্রতিটি উৎসবই পরিবারের কাছে শোকের দিনে পরিণত হয়েছে। মা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। বাবাও ছেলের স্মৃতি ভুলতে পারেন না।

স্মৃতিকে ধরে রাখতে নানা উদ্যোগ

মুগ্ধের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নাম রাখা হয়েছে ‘শহীদ মীর মুগ্ধ তোরণ’। তার আত্মত্যাগের স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এই নামকরণ করা হয়েছে।

আজ (১৮ জুলাই) তার শাহাদাতবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাকে স্মরণ করা হচ্ছে। মানবতা, সাহস এবং নিঃস্বার্থ সেবার প্রতীক হয়ে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ আজও বেঁচে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে।


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission