কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ। একসময় ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ বনে ঢাকা ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে ধ্বংসের চিত্র। হাজার হাজার একরের ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলা হয়েছে। চারদিকে পড়ে আছে গাছের কাণ্ড, শুকনো ডালপালা ও পোড়ানো গাছের অবশিষ্টাংশ।
সংবাদমাধ্যম বলছে, স্থানীয়দের ভাষ্য, কিছুদিন আগেও যে এলাকায় সবুজের সমারোহ ছিল, সেখানে এখন তৈরি করা হয়েছে মাটির বাঁধ। এসব বাঁধের মাধ্যমে লবণাক্ত পানি আটকে তৈরি করা হচ্ছে চিংড়ির ঘের। আর এর জন্য নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন।
সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাদিয়া দ্বীপের বিভিন্ন অংশে নদীর তীর ঘেঁষে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কয়েকশ গজ পরপর বসানো হয়েছে পানি নিয়ন্ত্রণের ফটক। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে চিংড়ি চাষের জন্য লবণাক্ত পানি ধরে রাখা হচ্ছে।
দ্বীপের পশ্চিম অংশের বন অনেক আগেই কাটা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর পূর্ব অংশের গাছগুলো সম্প্রতি কাটা হয়েছে। অনেক জায়গায় এখনো শুকিয়ে না যাওয়া গাছ পড়ে আছে, যা শিগগিরই পুড়িয়ে ফেলার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উপগ্রহের ছবি ও আকাশচিত্রেও সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। একসময় উপকূল রক্ষাকারী এই সবুজ বেষ্টনী এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, এই বন ধ্বংসের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তাদের জীবনে। ম্যানগ্রোভ বনের খালগুলোতে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণী পাওয়া যেত। এখন বন কমে যাওয়ায় মাছের পরিমাণও কমেছে।
ঘটিভাঙ্গার জেলে আসরউদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, গত কয়েক বছরে সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বনের বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। আগে মাছ ধরে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা আয় করতেন তিনি। এখন সেই আয় নেমে এসেছে প্রায় এক হাজার টাকায়।
তিনি বলেন, অনেক ছোট জেলে জীবিকা হারিয়ে সংকটে পড়েছেন। বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে কথা বলতে ভয় পান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মহিষপালক মো. শাহাবুদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে জানান, একসময় সোনাদিয়া ছিল ঘন বন ও চারণভূমিতে ভরা। তিনি বাবার সঙ্গে এখানে শতাধিক মহিষ পালন করতেন। কিন্তু বন উজাড় হওয়ায় এখন আগের মতো জায়গা নেই, বাধ্য হয়ে অনেক মহিষ বিক্রি করতে হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সোনাদিয়া দ্বীপের প্রায় ৯ হাজার ৪৬৬ একর জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়। পরে আরও ১২ হাজার একরের বেশি জমি হস্তান্তর করা হয়। পর্যটন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জমি হস্তান্তরের পর সুযোগ নিয়ে একটি চক্র ম্যানগ্রোভ বন কেটে সেখানে চিংড়ি চাষ শুরু করে। বন বিভাগের টহল কার্যক্রমও একসময় বন্ধ হয়ে যায়।
প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সোনাদিয়ায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অতীতে চকরিয়ার ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের মতো। দখলদারদের সরানো গেলে আবারও এই বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যানগ্রোভ বন শুধু গাছ নয়, এটি উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙন থেকে উপকূলকে রক্ষা করে এই বন। পাশাপাশি মাছ, কাঁকড়া, পাখিসহ নানা প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু গাছ লাগালেই ম্যানগ্রোভ বন ফিরবে না। প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে বন ধ্বংস বন্ধ করতে হবে।
সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরটিভি/জেএমএ



