জিয়াউর রহমান: এক সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও জাতি গঠনের কারিগর

বাসস

সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:১৯ এএম


জিয়াউর রহমান: এক সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও জাতি গঠনের কারিগর
জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

‘আমি মেজর জিয়াউর রহমান... বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি’— ১৯৭১ সালের সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে এটিই ছিল তৎকালীন মেজর জিয়ার সেই ঐতিহাসিক আহ্বান। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়ে দেশকে রক্তগঙ্গায় পরিণত করেছিল, যখন গোটা জাতি দিশেহারা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ঠিক তখনই তার এই কালজয়ী ঘোষণা আশার আলো হয়ে আসে।

বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠেন ‘৭১-এর কণ্ঠস্বর’। সেই ভয়াল রাতে কামানের গর্জন আর গুলির শব্দে যখন বাঙালির ঘুম ভেঙেছিল, সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে তার স্বাধীনতার ঘোষণা দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করে। প্রথমে নিজের ব্যাটালিয়নের সামনে এবং পরবর্তীতে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া তার সেই ঘোষণা সব দ্বিধা ও বিশৃঙ্খলা দূর করে মানুষকে সশস্ত্র প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে।

মেজর জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণা স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশ কেবল স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এটি মুক্তি সংগ্রামের বৈধতাকে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনোবল বাড়িয়ে দেয়। ভয় ও অনিশ্চয়তার সেই চরম মুহূর্তে তার কণ্ঠস্বর মানুষের মনে সাহস জোগায় এবং বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

বিজ্ঞাপন

শৈশব থেকেই জিয়াউর রহমান ছিলেন আপসহীন ও স্বাধীনচেতা। স্কুলজীবন থেকেই পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে ব্যথিত করত। তার হৃদয়ে কেবল একটিই স্বপ্ন ছিল— সুযোগ পেলেই পাকিস্তানিদের ঔদ্ধত্যের জবাব দেওয়া। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে তিনি সেই আজন্ম লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে। ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন নিয়ে বিদ্রোহ করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীনও জিয়ার মনে-প্রাণে ছিল বাংলাদেশ ও তার মানুষের প্রতি গভীর টান। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে অবস্থানরত বাঙালি ক্যাডেটরা যখন বিজয় উল্লাস করছিলেন, তখন পাকিস্তানি ক্যাডেটরা বাংলাদেশের নেতাদের প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে, ‘গাদ্দার’ বলে গালি দেয়। তরুণ জিয়া এর তীব্র প্রতিবাদ জানান, যা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে গড়ায়। বিষয়টি মীমাংসার জন্য একটি বক্সিং ম্যাচের আয়োজন করা হয়। জিয়া বাঙালির অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় বক্সিং গ্লাভস হাতে রিংয়ে নামেন। লতিফ নামে এক পাকিস্তানি ক্যাডেট তাকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার দম্ভোক্তি করলেও জিয়া মাত্র ৩০ সেকেন্ডের বিধ্বংসী লড়াইয়ে তাকে ধরাশায়ী করেন। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি এভাবেই বাঙালির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় অকুতোভয় ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশের এক চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে তিনি জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান পুনরায় দেশের হাল ধরেন। দেশজুড়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার মাধ্যমে তিনি সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছে এক অনন্য ও গ্রহণযোগ্য নেতায় পরিণত হন। তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বই পরবর্তীতে তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন করে।

আরও পড়ুন

একজন সফল ‘জাতি গঠনের কারিগর’ হিসেবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। তার ১৯ দফা রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা। আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির তিন প্রধান স্তম্ভ— কৃষি, পোশাক শিল্প এবং রেমিট্যান্স— এই তিনটিরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল তার শাসনামলে। তার সময়েই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে দেশে এনে পোশাক শিল্পের বিপ্লব ঘটান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানির বিশাল দ্বার উন্মোচন করেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় শাসন থেকে দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে এনে তিনি একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক ও প্রকৃত জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বহুদলীয় রাজনীতির এই পুনর্জাগরণ দেশের জন্য এক যুগান্তকারী রূপান্তর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তিনি বাংলাদেশের মানুষকে একটি সুস্পষ্ট পরিচয় দিয়েছেন— ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ নানা মত, পথ ও ধর্মের বৈচিত্র্যময় জনপদ, যেখানে মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনধারা ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয়তাবাদ কেবল ভাষা বা সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়, বরং এর মূল ভিত্তি হওয়া উচিত দেশের ভৌগোলিক পরিচয়।

জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটান এবং দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতার পথে পরিচালিত করেন। স্বপ্রণোদিত হয়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করার মাধ্যমে তিনি এ দেশের কৃষিখাতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করেন।

বিএডিসি’র (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) মাধ্যমে জিয়াউর রহমান কৃষকদের মাঝে সার, উন্নত বীজ ও কীটনাশকের যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করেন। বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি তিনি নতুন নতুন শিল্প গড়ার ডাক দেন, যা বেকারদের একটি কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করতে সহায়তা করে। এভাবেই কৃষক ও শ্রমিকের ভাগ্য বদলাতে তিনি ‘উৎপাদমুখী রাজনীতি’র সূচনা করেন এবং দেশের যুব ও নারী সমাজকে স্বাবলম্বী ও ক্ষমতায়ন করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

জিয়াউর রহমান বৈশ্বিক কূটনীতিতেও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে কেবল ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আমেরিকা ও চীন পর্যন্ত প্রসারিত করেন। তার উদ্যোগেই মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট ‘সার্ক’ (SAARC) গঠনের নেপথ্যে তিনি প্রধান রূপকারের ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া তার সুদক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতার কারণেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

জিয়াউর রহমান কেবল একটি নাম বা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতা নন, বরং জাতীয় সংকটের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে তিনি একজন ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে তিনি দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন; এরপর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর পুনরায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেন এবং পরবর্তীতে দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেন। এ কারণেই তাকে ‘বারবার দেশের ত্রাণকর্তা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। জাতির প্রতি তার এই গৌরবোজ্জ্বল কর্ম এবং অসামান্য অবদানই তাকে ‘এক অকুতোভয় দেশপ্রেমিক ও মহান জাতি গঠনের কারিগর’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।

আরটিভি/আইএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission