ময়লার ভাগাড় থেকে ইশতেহার দিয়ে সংসদে যাওয়ার লড়াইয়ে সেই ‘ওয়াসা মিজান’

আরটিভি নিউজ

সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৯:২৭ এএম


ময়লার ভাগাড় থেকে সংসদে যাওয়ার লড়াইয়ে সেই ‘ওয়াসা মিজান’
২০১৯ সালে ওয়াসার পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে তৎকালীন ওয়াসা এমডিকে খাওয়াতে গিয়েছিলেন ঢাকা–৪ আসনের প্রতিবাদী মুখ মিজানুর রহমান। এবার তিনি ভোটের লড়াইয়ে। ফাইল ছবি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে যত আলোচিত নাম, তার মধ্যে ব্যতিক্রম একজন মিজানুর রহমান। সর্বপ্রথম মিডিয়ার লাইমলাইটে আসেন ঢাকা ওয়াসার দূষিত পানি নিয়ে প্রতিবাদ করে; পরিচিতি পান ‘ওয়াসা মিজান’ নামে। শ্যামপুর, কদমতলী, যাত্রাবাড়ীর আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা–৪ আসনে এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন তিনি। ওয়াসার পানি ছাড়াও এই এলাকার আরও অনেক সমস্যা ও সংকটের বিরুদ্ধেও বরাবরই সোচ্চার তিনি।

সাল ২০১৯। ওই সময় ঢাকা ওয়াসার দীর্ঘদিনের দূষিত পানির সমস্যা নিয়ে ব্যতিক্রমী এক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মিজানুর রহমান। ওয়াসার পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে সেটা তিনি খাওয়াতে গিয়েছিলেন তৎকালীন ওয়াসা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানকে। এ ঘটনাই তাকে এক ‘প্রতিবাদী মুখ’ হিসেবে পরিচিতি পাইয়ে দিয়েছিল দেশ জুড়ে। তবে, সেই খ্যাতি পেয়েই বসে যাননি তিনি। নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সবসময়ই সোচ্চার থেকেছেন তিনি। 

ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের মতো ভোটের লড়াইয়েও ‘ওয়াসা মিজান’ নেমেছেন ব্যতিক্রমী পদক্ষেপে; নিজের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন ময়লার ভাগাড়ের পাশে বসে।

wasa-mizan

রাজধানীর অপরিকল্পিত উন্নয়নের শিকার তার ঢাকা–৪ আসন কর্তৃপক্ষের অবহেলায় রয়েছে—এমন দাবি করে প্রতীকী এই পদক্ষেপ নিয়েছেন ফুটবল প্রতীকের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী।

গত ৩০ জানুয়ারি দুপুরে জুরাইন-দয়াগঞ্জ রাস্তার পাশে মুন্সিবাড়ী মোড়ের ময়লার ভাগাড়ের পাশে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে মিজানুর রহমান তার নির্বাচনি ইশতেহার দেন। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনের মতো তার ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো অনেকটা আলাদা। 

আরও পড়ুন

যেমন সেই ইশতেহারে আছে  মহল্লা সংস্কৃতি ফিরিয়ে এনে গলির ভুক্তভোগী জনগণকে দিয়ে গলি সমাজ গঠনের মাধ্যমে গলির নাগরিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে তদারকি ও জবাদিহির কাঠামো গড়ে তোলা; সংসদ সদস্যের কাছে পৌঁছানো ও তাঁর জবাবদিহির জন্য ‘এমপি হটলাইন ও ওয়েবসাইট’ চালু; জলাবদ্ধতা নিরসনে ক্রমাগত রাস্তা উঁচু করে মানুষের বাসাবাড়ি দোকানপাটকে বৃষ্টির পানিতে ডোবানোর ‘ভ্রান্ত’ উন্নয়নের বদলে সহজ, টেকসই পদ্ধতি ও সুলভে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি।

তিন মাসের মধ্যে রাস্তা মেরামতের উদ্যোগ এবং রাস্তা সুরক্ষা চার্টার (ঘোষণাপত্র) প্রকাশের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। তার ইশতেহারে উল্লেখ আছে, জনগণের সম্মতি নিয়ে এই এলাকার জন্য রাস্তা সুরক্ষা চার্টার প্রকাশ ও বাস্তবায়ন করা হবে। সেই চার্টারে এই নিয়ম থাকবে যে এলাকার যেকোনো রাস্তা খোঁড়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গলি সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে ৭ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে এসে কাজ শেষ করে রাস্তা যেমন ছিল তেমন করে রেখে যেতে হবে।

এছাড়া, পানির সংকট নিয়ে স্থানীয় বিশেষ সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিলের বিপরীতে সেবা দিতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ওয়াসাকে বাধ্য করার কথাও ইশতেহারে রেখেছেন মিজানুর রহমান। গ্যাস বৈষম্য বন্ধ করতে তিতাসকে বাধ্য করা এবং এলপিজি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ভ্রাম্যমাণ সিলিন্ডার বিক্রয় ট্রাক আনার মাধ্যমে এলাকায় নায্যমূল্যে সিলিন্ডার গ্যাস দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

সেইসঙ্গে প্রতিটি মহল্লার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক ওএমএস বা টিসিবির সেবা এবং হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত এবং জটিলতাহীনভাবে কার্ড ও পণ্য প্রাপ্তিসেবা নিশ্চিত করা; পচনশীল (জৈব বর্জ্য), অপচনশীল (রিসাইকেল করা যায় এমন বর্জ্য) ও বিপজ্জনক বর্জ্য—এই তিন ক্যাটাগরিতে বর্জ্য সংগ্রহ চালু করা; জনগণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে করে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার খেলার মাঠগুলো এবং ঘোষিত সরকারি স্পর্শকাতর স্থাপনা ছাড়া বাকি সব সরকারি স্থাপনার উন্মুক্ত পরিসরকে বিকেল বেলা ও ছুটির দিনে খেলাধুলা ও অবসর কাটানোর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে একই ইশতেহারে।

সংসদ সদস্য হলে রেললাইনের দুই পাশে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন ‘ওয়াসা মিজান’। ময়লা পোড়ানো বন্ধ এবং দূষণকারী কারখানার তালিকা তৈরি ও নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়া; শব্দদূষণ বন্ধ করা; ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এলাকার প্রতিটি বাসাবাড়িতে একজন করে ডেঙ্গুযোদ্ধা তৈরি করা; নিয়মিত প্রত্যেক ওয়ার্ডে মাসে একটি ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করা; ঝুঁকিপূর্ণ অনিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন মেরামতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

মিজানের ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, নারীদের একটা নারী নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে কোনো নারীর ওপর হামলা বা হয়রানি হলে গলি বা এলাকার নারীরা একসঙ্গে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিহত করতে পারেন। পাশাপাশি হকার, টংদোকানদারদের উচ্ছেদ না করে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় আনা এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে সংসদে দেশবিরোধী, প্রাণপ্রকৃতিবিরোধী প্রকল্প বন্ধ করতে লড়াই করা, বাজেটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, গোপন চুক্তির বিরোধিতা করার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেবেন তিনি।

এর আগে, নির্বাচনের লড়াইয়ে নামার পথেও বাঁধা পেয়েছেন ‘ওয়াসা মিজান’। বাতিল করা হয়েছিল তার প্রার্থিতা। কিন্তু, পরে আবার শুনানি শেষে প্রার্থিতা ফিরেও পান তিনি। 

রিটার্নিং কর্মকর্তারা বলেছিলেন, দৈবচয়নের ভিত্তিতে তারা যে ১০ জন ভোটারের তথ্য যাচাই-বাছাই করেন, তার মধ্যে ছয় জনের ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি এবং চারজনের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে মাত্র একজনকে ভেরিফাই করা যায়। পরে এই সমর্থকদের সশরীরে হাজির করা ও এফিডেভিট প্রদানের মাধ্যমে দেখা যায়, তারা প্রকৃতপক্ষে মিজানুর রহমানকে সমর্থন করেছেন। এই প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশন তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission