চীন সরকারের আমন্ত্রণে সম্প্রতি বিএনপির ২০ তরুণের একটি প্রতিনিধি দল দেশটি সফরে যায়। এই দলে ছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসম্পাদক জান্নাতুল নওরীন উর্মি। সফর শেষে দেশে ফিরে আরটিভি অনলাইনের মুখোমুখি হন তিনি; শেয়ার করেন এই বিশেষ সফরের অভিজ্ঞতার কথা।
১. চীনের উন্নয়নের কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?
উর্মি: চীনের নগর পরিকল্পনা, বিশেষ করে Planning Exhibition Hall-এ প্রদর্শিত দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত পরিকল্পনা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। সেখানে শুধু ভবিষ্যতের শহরের নকশা নয়, বরং পরিবেশ, পরিবহন, আবাসন ও শিল্পায়নের একটি সমন্বিত রূপ দেখানো হয়। এটি চীনের উন্নয়নের পেছনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিকল্পনার প্রতি তাদের আস্থা ও দূরদৃষ্টিকে প্রকাশ করে।
২. বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় চীনের কোন অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে?
উর্মি: Waste-to-Energy বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন মডেল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে। Chongqing Sanfeng Environment Group-এর প্ল্যান্ট দেখে স্পষ্ট হয়েছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্য কেবল পরিবেশের জন্য বোঝা নয়, বরং বিদ্যুৎ ও সম্পদের উৎস হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা জানিয়েছে, প্রথাগত ল্যান্ডফিলের পরিবর্তে উন্নত ইনসিনারেটর ও ফ্লু-গ্যাস ক্লিনিং সিস্টেম ব্যবহার করলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরের বর্জ্য সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা পরিবেশ দূষণ কমাবে এবং ল্যান্ডফিলের প্রয়োজনীয়তা ৯০% পর্যন্ত কমাতে পারে।

৩. বাংলাদেশ AI বিপ্লবে পিছিয়ে পড়া এড়াতে কী করতে পারে?
উর্মি: প্রথমত, সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় AI কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে, যেমন চংকিং রোবট এআই অ্যাপ্লিকেশন ডেমনস্ট্রেশন সেন্টার বা সাংহাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIAIR)-এর মতো প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা। এই সফর আমাদের দেখিয়েছে যে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পে AI-এর বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে হবে। প্রযুক্তি বিনিময় ও দক্ষতা উন্নয়নে এই ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৪. বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে চীনের কোন অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করা সম্ভব?
উর্মি: Minzhu গ্রামের নারীকেন্দ্রিক উদ্যোগ ও টেকসই উন্নয়ন মডেল বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য দারুণ অনুপ্রেরণা। সেখানে ৪৬% নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্টার্টআপে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল, যা গ্রামের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অবস্থার আমূল পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশেও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় নারীদের জন্য জৈব সার উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা যেতে পারে। গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনের এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখতে পারি কিভাবে নারীদের সঠিক সুযোগ ও প্রশিক্ষণ দিলে তারা সমগ্র গ্রামকে টেকসই উন্নয়নের পথে পরিচালিত করতে পারে।

৫. আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ কোন চীনা মডেল অনুসরণ করলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে?
উর্মি: আমার মতে, শিল্পের সঙ্গে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও তরুণদের সম্পৃক্ত করার সমন্বিত মডেলটি সবচেয়ে ফলপ্রসূ। যেমন Urban Planning Exhibition Hall, Financial Center-এ তরুণদের ইন্টার্ন উদ্যোক্তা হিসেবে সম্পৃক্ত করা এবং Humanoid Robot Incubator-এর মতো উদ্যোগ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিল্পের এই সংযোগ বাংলাদেশকে উচ্চ প্রযুক্তির অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করবে।
৬. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহনে চীনের কোন মডেল বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে?
উর্মি: AI, বিগ ডাটা এবং স্মার্ট গভর্নেন্স ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা মডেলটি বাংলাদেশের জন্য খুবই কার্যকরী হতে পারে। সাংহাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIAIR)-এ দেখেছি কিভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডাটা এনালাইটিক্স ব্যবহার করে ট্রাফিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, যানজট কমানো এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করা যায়। বাংলাদেশও এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার শহরগুলোকে স্মার্ট ও টেকসই করতে পারে।

৭. তরুণদের জন্য চীনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
উর্মি: তরুণদের জন্য চীনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে বিনিয়োগ, পরিশ্রম ও নৈতিক নাগরিক হওয়ার গুরুত্ব। সাংহাই চিন উ অ্যাথলেটিক ফেডারেশন পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝতে পেরেছি যে, ‘শারীরিক, বৌদ্ধিক ও নৈতিক’ (体、智、德) শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া একটি জাতিকে কীভাবে শক্তিশালী করে তোলে। ‘শরীর শক্তিশালী করো, জাতি ও জনগণকে শক্তিশালী করো’ এই প্রতিপাদ্য আমাদের তরুণদের কেবল পড়াশোনা নয়, শারীরিক ও নৈতিক গঠনেও মনোযোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। এই কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ বাংলাদেশেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
৮. বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আপনি কীভাবে দেখছেন। সম্পর্ক জোরদারে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?
উর্মি: বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। বর্তমানে সম্পর্কটি ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত হয়েছে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ ও টেকসই উন্নয়নে সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে। সম্পর্ক জোরদারে নিম্নলিখিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

উচ্চ প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো: চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, সৌর ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বাণিজ্য ভারসাম্য ও বৈচিত্র্য আনা: চীনের বাজারে আরও বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও মূল্য সংযোজিত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায়।
তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার: ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর জন্য এই সফরের মতো তরুণ প্রতিনিধি বিনিময় কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে।

৯. চীনের উন্নয়নের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি কী- দূরদর্শী নেতৃত্ব, পরিকল্পনা, প্রযুক্তি নাকি মানবসম্পদ? বিশ্ববিদ্যালগুলোর ভূমিকা কতটা জোরালো?
উর্মি: আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই চারটি উপাদানের সমন্বয়ই চীনের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি, তবে দূরদর্শী নেতৃত্ব ও পরিকল্পনাকে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এই নেতৃত্বই প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ তৈরি করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো। তারা শুধু শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও গবেষণায় দক্ষ করে তোলে না, বরং শিল্পের সঙ্গে সংযোগ তৈরির মাধ্যমে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে, যেমনটি রোবটিক্স ও AI কেন্দ্রগুলোতে দেখা গেছে।
১০. এই সফর শেষে বাংলাদেশে কোন পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দেখতে চান? নীতিনির্ধারকদের জন্য চীনের তিনটি বিষয় গ্রহণের পরামর্শ যদি দিতে বলা হয়...
উর্মি: এই সফর শেষে আমি তরুণ সমাজের মধ্যে একটি ‘উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের’ মানসিকতার পরিবর্তন দেখতে চাই, যেখানে তারা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা ও সমস্যার সমাধানকারী হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য চীনের তিনটি বিষয় গ্রহণের পরামর্শ:
১. বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও সম্পদ উৎপাদন মডেল (Waste-to-Energy): বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা সমাধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য Chongqing Sanfeng-এর মতো কারখানা স্থাপন করা। এটি ল্যান্ডফিলের চাপ কমাবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করবে।
২. শিল্প-শিক্ষা-গবেষণার সমন্বয় (Industry-Academia-Research Collaboration): তরুণদের AI, রোবোটিক্স ও উচ্চপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে এবং চাকরির বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে ইন্টার্নশিপ ও উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলা ।
৩. গ্রামীণ নারীকেন্দ্রিক টেকসই উদ্যোগ (Rural Women-led Sustainable Initiatives): Minzhu গ্রামের আদলে গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশ উভয়েরই উন্নতি ঘটাবে।
আরটিভি/আইএম




