যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) ডিটেনশন সেন্টারে দীর্ঘ দুই মাস 'অমানবিক' পরিবেশে বন্দি থাকার পর অবশেষে হার মানলেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জয়তু চৌধুরী। শুরুতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি থাকলেও ডিটেনশন সেন্টারের দুর্বিষহ পরিস্থিতি তাকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। শেষ পর্যন্ত বুকভরা আক্ষেপ আর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্ত্রীকে একা রেখেই তিনি গত ফেব্রুয়ারিতে ‘সেলফ-ডিপোর্টেশন’ বা স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফেরার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।
২৪ বছর বয়সী জয়তু চৌধুরী ২০২১ সালে এফ-১ স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে ইলিনয় ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ফিন্যান্স ও কম্পিউটার সায়েন্সের মেধাবী এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল সুন্দর এক ভবিষ্যৎ গড়া। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জটিলতায় ২০২৫ সালের আগস্টে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এছাড়া গাড়ি চালানোর সময় মদ্যপ থাকা এবং চুরির মতো কিছু বিচ্ছিন্ন অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। এর প্রেক্ষিতে গত বছরের ডিসেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করে আইসিই।
নিউজউইককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়তু তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, শুরুতে আমার জেদ ছিল যে আমি লড়ে যাব এবং আমার স্ত্রীর (মার্কিন নাগরিক) কাছে ফিরে যাব। কিন্তু ডিটেনশন সেন্টারের পরিবেশ আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে। এক পর্যায়ে নিজেকে এতই অসহায় আর নিঃস্ব মনে হচ্ছিল যে মনে হলো আর সম্ভব নয়।
তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিবাসন ব্যবস্থা মানুষকে মানসিকভাবে এমনভাবে ভেঙে দেয় যাতে তারা লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
এদিকে জয়তুর আনা অমানবিক আচরণের অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)। সংস্থাটির দাবি, তাদের প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। এমনকি জয়তুর টিকিটের খরচ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ডিএইচএস জানায়, পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে তারা সরকারি খরচেই জয়তুকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
বর্তমানে জয়তু বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তবে দেশের বিদ্যমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কোনো কাজ খুঁজে পাওয়া তার জন্য পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের দেশে ফিরেও এক ধরণের অনিশ্চয়তার বৃত্তে বন্দি তিনি।
এদিকে জয়তুর এই বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে তার পরিচিত জনরা। জয়তু ও তার স্ত্রীর পরিচিত মহলের পক্ষ থেকে ‘ম্যারি এলিজ’ নামে এক ব্যক্তি অনলাইনে অর্থ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন। উদ্দেশ্য—আইনি সহায়তার মাধ্যমে জয়তুকে আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া এবং দম্পতিটিকে পুনর্মিলিত করা।
সিস্টেমের চাপে পিষ্ট হয়ে দেশ ছাড়লেও, জয়তু এখনো স্বপ্ন দেখছেন আবারও তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার। তবে ডিটেনশন সেন্টারের সেই দুঃসহ দুই মাস তার জীবনে এক দগদগে ক্ষত হয়ে থাকবে আজীবন। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
আরটিভি/এমএইচজে



