লিমন-বৃষ্টি খুনের আগে পুলিশকে একাধিকবার সতর্ক করেছিল হিশামের পরিবার

আরটিভি নিউজ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ , ১২:৫৭ পিএম


লিমন-বৃষ্টি খুনের আগে পুলিশকে একাধিকবার সতর্ক করেছিল হিশামের পরিবার
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় খুন হওয়া বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এবার জানা গেল, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হিশাম আবুঘারবিয়েহ যে মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং বিপজ্জনক তা নিয়ে পুলিশকে একাধিকবার সতর্ক করেছিল তার পরিবার। 

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই দাবি করেছেন হিশামের ছোট ভাই আহমদ আবুঘারবিয়েহ।   

তিনি সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, হিশামের অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে আগেও একাধিকবার পুলিশকে সতর্ক করেছিলেন তারা। হিশাম হুটহাট রেগে যেতেন এবং রেগে গেলেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। 

এমনকি হিশাম প্রায়ই মাঝরাতে চিৎকার করে নিজেকে ঈশ্বর দাবি করতেন বলেও জানিয়েছেন আহমদ। 

লিমন-বৃষ্টি খুনের ব্যাপারে হিশামের ২২ বছর বয়সী এই ভাই বলেন, হিশাম যে রুমমেটদের সঙ্গে থাকত, তা আমি জানতাম না। ওর হয় একা থাকা উচিত ছিল, না হয় গৃহহীন হয়ে পথে থাকা উচিত ছিল।

গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি খুন হয়েছেন বলে খবর আসে দেশে। এর আগে, ১০ দিন ধরে কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তাদের। শুক্রবার ফ্লোরিডার টাম্পা বে-তে হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতু এলাকা থেকে উদ্ধার হয় লিমনের মরদেহ। তার শরীরে পাওয়া যায় ছুড়িকাঘাতের বেশ কয়েকটি চিহ্ন। অপরদিকে দুইদিন পর একই এলাকায় একটি জলাধারে পাওয়া যায় আরেকটি খণ্ডিত মরদেহ। তবে, সেটি বৃষ্টির কি না- তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এখনও।  

এদিকে মামলার প্রসিকিউটররা বলছেন, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার পর ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুতে অন্তত ছয়বার যাওয়া-আসা করেছেন আসামি হিশাম। খুনের আলামত নষ্টের উদ্দেশ্যে মরদেহ ও তাদের জিনিসপত্র সেতু থেকে পানিতে ফেলে দিতে হিশাম এ কাজ করেছেন বলে ধারণা তাদের। 

লিমনের মরদেহ উদ্ধারের দিন নিজের পরিবারের কাছেও গিয়েছিলেন হিশাম। তার ভাই আহমদ আবুঘারবিয়েহ জানান, গত শুক্রবার সকালে হিশাম হঠাৎ তাদের বাড়িতে হাজির হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে ফোন করেছিলেন। তিনিও ফোনদাতাদের একজন ছিলেন।

আহমদ বলেন, সে খুবই অদ্ভুত আচরণ করছিল, তাই তাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আমি পুলিশ ডাকি। 

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই পরিবারের সঙ্গে হিশাম আবুঘারবিয়েহের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালেও হিশাম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার দিন লিভিং রুমে হিশামকে কেবল তোয়ালে পরা অবস্থায় ভিডিও গেম খেলতে দেখেন তার ছোট বোন। ওই সময় ছোট বোন এর প্রতিবাদ জানালে হিশাম তার দিকে এগিয়ে যান এবং চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন।  

গত শুক্রবারও বেশ নাটকীয়ভাবে হিশাম আবুঘারবিয়েহকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের ডেপুটিরা যখন তাকে ঘিরে ধরেন, তখনও তিনি কেবল একটি তোয়ালে পরা অবস্থায় হাত তুলে বেরিয়ে আসেন। এরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরও পড়ুন

নিহতদের পরিবারের উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়েছেন হিশামের ভাই আহমদ। এতে তিনি বলেছেন, আমি তাদের কথা ভাবা বন্ধ করতে পারছি না। আমার খুবই খারাপ লাগছে। যা ঘটেছে তার জন্য আমি সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী। আমি এবং আমার পুরো পরিবার প্রচন্ড লজ্জা ও অপরাধবোধে ভুগছি। আমরা অতীতেও পুলিশকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম।

আদালতের নথি অনুযায়ী, পরিবারের পক্ষ থেকে হিশাম আবুঘারবিয়েহের বিরুদ্ধে দুইবার সুরক্ষামূলক আদেশের (প্রোটেক্টিভ অর্ডার) আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৩ সালের আবেদনটি মঞ্জুর হলেও ২০২৫ সালের আবেদনটি খারিজ হয়ে যায়। 

২০২৫ সালের আবেদনটি খারিজ করার সময় বিচারক উল্লেখ করেন যে, শারীরিক লাঞ্ছনার (ব্যাটারি) ফৌজদারি অভিযোগগুলো যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়নি, তাই এই অনুরোধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। 

আহমদ জানান, আর্থিক সংকটের কারণে ২০২৩ সালে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ নিয়ে তিনি আর সামনে এগোননি। তিনি বলেন, আমি অভিযোগ তুলে নিয়েছিলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল এতে অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু, ওই সিদ্ধান্তের পরপরই আমি অনুতপ্ত হয়েছিলাম।

২০২৩ সালের সেই সুরক্ষামূলক আদেশের আবেদনের একটি কপি সিবিএস নিউজের হাতে এসেছে। সেখানে আহমদ লিখেছিলেন, তার ভাই তাকে কয়েকবার ঘুষি মেরেছিলেন ও শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। তিনি লেখেন, এতে আমার রক্তপাত হয় এবং মুখে কালশিটে পড়ে যায়। আমি পুলিশকে ফোন করতে বাইরে গেলে সে পরিবারের মিনিভ্যানটি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কাজ হবে না বুঝতে পেরে সে আবার ফিরে আসে।

অন্য এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে ছোট ভাই অভিযোগ করেন, হিশাম তার মায়ের সঙ্গে সামান্য তর্কের পর পুরো বসার ঘর (লিভিং রুম) তছনছ করে ফেলেছিলেন। প্রায়ই তার ভাই ‘মাঝরাতে চিৎকার করে নিজেকে ঈশ্বর দাবি করতেন এবং বলতেন যে তার সামনে মাথা নত করা উচিত সবার।’

হিশাম আবুঘারবিয়েহ পক্ষে লড়ছে হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডারের অফিস। সংস্থাটির এক মুখপাত্র সিবিএস নিউজকে বলেন, আমরা বুঝতে পারছি এই মামলাটি নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। তবে, পেশাগত নৈতিকতা এবং আমাদের মক্কেলের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থে আমরা জনসমক্ষে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছি। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মক্কেলের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়েই আমরা বর্তমানে মনোনিবেশ করছি।  

আহমদ আবুঘারবিয়েহের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করেনি হিলসবরো কাউন্টি স্টেট অ্যাটর্নির কার্যালয়। তবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তারা জানিয়েছে, হিশাম আবুঘারবিয়েহ সমাজের জন্য এখনও এক বড় হুমকি এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখা উচিত। 

স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ বলেন, এই অত্যন্ত কঠিন সময়ে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা রইল। তারা সত্য জানার জন্য যে অপেক্ষা করছেন এবং আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি। 

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission