মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা যা কেউ অবজ্ঞা করতে পারে না। যে কেউই এই বাঁচার খেলায় অংশীদার হোক — একদিন সবাইকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। কোরআন স্পষ্টভাবে বলেছে, প্রতিটি প্রাণই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে (সূরা আল ইমরান : ১৮৫)। তাই মৃত্যুকে ভুলে থাকা নয় — সেটাকে মনের মাঝে স্থায়ীভাবে স্মরণ রাখা মুমিনের জন্য দরকারি।
মৃত্যুকে মনে রাখা কেবল ভীতির কারণ নয়; বরং এটা মানুষের অন্তরকে নরম করে, দুনিয়ার মোহ থেকে দূরে রাখে এবং পরকালকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। নিয়মিত মৃত্যুস্মৃতিতে মানুষ বাস্তবতায় ফিরে আসে—দুনিয়ার সাময়িক পিছনে পড়ে যায় আর আখিরাত-উপযোগী কাজগুলো গুরুত্ব পায়। রাসুল (সা.) নিজেও ভোগ-বিলাস নাশকারী এই মৃত্যুকে বারবার স্মরণ করার উপদেশ দিয়েছেন (তিরমিজি)।
জীবন পরীক্ষা-পরীক্ষায় ভরা: দারিদ্রতা, রোগ, শোক, অপমান—এসব দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়। আল্লাহ বলেন, তিনি জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমাদের পরীক্ষা করা হয়—কে উত্তম কাজ করে (সূরা আল মুলক : ২)।
পরীক্ষা শেষে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া যখন ঘটে, তখন মুমিনের জন্য মৃত্যু দুনিয়ার কষ্ট থেকে মুক্তির এক উপায় হয়ে ওঠে। নবী (সা.) উল্লেখ করেছেন যে মুমিনকে মৃত্যুর মাধ্যমে স্বস্তি পৌঁছে। হযরত আলী (রা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত মৃত্যুকে স্মরণ করে, সে অল্প সম্পদেই সন্তুষ্ট থাকে এবং লোভ-কৃপণতা কমে যায়।
দুঃখ-খেদে কেউ নিজে-ই মৃত্যু চাওয়া ইসলামে অনুমোদিত নয়; আত্মহত্যাও হারাম। তবে শহীদ হওয়ার ইচ্ছা সম্মত। নবী (সা.) সতর্ক করেছেন যে কষ্টের জন্য কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে (সহিহ বুখারি)। বুদ্ধিমতভাবে এক দোয়া পাল্টা-বলে নির্দেশ আছে: ‘হে আল্লাহ! যদি আমার জীবনে কল্যাণ থাকে তবে আমাকে বাঁচিয়ে রাখো, আর যদি মৃত্যু আমার জন্য উত্তম হয় তবে আমাকে মৃত্যুদান করিও।’ (সহিহ বুখারি) — এই দোয়ায় সৌম্য সিদ্ধান্ত ও নবীজির নির্দেশ দুটোই নিহিত।
ইসলামে মৃত্যু কোনো চরম অন্তিম নয়; এটা আখিরাতের অনন্ত জীবনে প্রবেশের দোয়াজনক দরজা। তাই মৃত্যুকে স্মরণ করা মানে শুধু ভয় নয়—এটি পরকালের জন্য নিজেকে সাজানোর অনুপ্ৰেরণা।
বিপদে পড়লে ও প্রিয়জন মারা গেলে বলার দোয়া
কঠিন সময়ে কোরআন শিক্ষা দেয়: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ — ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং আমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সূরা বাকারা : ১৫৬)
মৃত্যুর সময়ে সহজতা চাইতে নবী (সা.) বিভিন্ন দোয়া করতেন—মৃত্যুর যন্ত্রণা সহজ করো, আমাকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করো এবং শয়তানের প্রলোভন থেকে কাবু রাখো (তিরমিজি, সহিহ মুসলিম, আবু দাউদ)।
প্রিয়জনের মৃত্যুকালে পড়ার উপদেশ হিসেবে কিছুবিশেষ দোয়া-দায়ের কথাও প্রচলিত আছে — আল্লাহর মহিমা স্মরণ, ক্রন্দন ও দরুদ সালাত পাঠ করা ইত্যাদি, যা শোককে সহনীয় করে এবং মৃতপ্রাণের জন্য দোয়া-ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।
ইসলাম মৃত্যুকে ভয়ভীতি ও হতাশার উৎস হিসেবে নয়, বরং একজন মুমিনের সতর্কতা ও প্রস্তুতির প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখে। যারা নিয়মিত মৃত্যুকে মনে রাখে, তারা দুনিয়ার মোহে বিলীন হয়ে পড়ে না; বরং রবকে স্মরণ করে, সৎ-নৈতিক জীবনযাপন করে এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুত থাকে। মৃত্যুচিন্তা মুমিনের পথপ্রদর্শক ও মুক্তি-কারক—এটাই মূল শিক্ষা।
আরটিভি/এমকে




