ইসলামে একাধিক বিয়ের বিধান নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এটি সহজ কোনো অনুমতি, আবার অনেকে এটিকে কঠোর দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে ইসলাম এই বিষয়টিকে কোনো সীমাহীন স্বাধীনতা হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত একটি শর্তসাপেক্ষ বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছে। নারী-পুরুষের অধিকার রক্ষা এবং পরিবার কাঠামোকে সুশৃঙ্খল রাখতে ইসলাম এতে সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে।
কোরআনের আলোকে অনুমতি
ইসলামে একজন পুরুষ সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখতে পারে, তবুও কঠোর শর্তসাপেক্ষে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً
উচ্চারণ: ফানকিহু মা তা-বা লাকুম মিনান নিসা-ই মাসনা ওয়া সুলা-সা ওয়া রুবা-আ, ফাইন খিফতুম আল্লা তা’দিলু ফাওয়াহিদাহ।
অর্থ: তোমরা নারীদের মধ্যে যাদের পছন্দ করো তাদের দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই গ্রহণ করো। (সূরা নিসা: ৩)
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ন্যায়বিচার করতে না পারলে একাধিক বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কেন ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছে?
ইসলাম এই বিধান দিয়েছে সমাজের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা করে। যেমন—
- সমাজে নারীর সংখ্যা অনেক সময় পুরুষের চেয়ে বেশি হতে পারে
- যুদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার কারণে পুরুষের মৃত্যু বেশি
- কিছু নারীর স্বামী না থাকলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে
- কিছু পুরুষের শারীরিক চাহিদা এক স্ত্রীর মাধ্যমে পূরণ না-ও হতে পারে
- স্ত্রীর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রেও পরিবার গঠনের প্রয়োজন হতে পারে
তবে এসব কোনো কারণই শর্ত ছাড়াই একাধিক বিয়েকে বৈধ করে না।
কঠোর শর্তই আসল বিষয়
ইসলামে একাধিক বিয়ে বৈধ হলেও শর্ত অত্যন্ত কঠোর—
- ভরণপোষণে পূর্ণ সমতা থাকতে হবে
- বাসস্থান ও দৈনন্দিন ব্যবহারে সমতা বজায় রাখতে হবে
- রাত যাপনে ন্যায়বিচার করতে হবে
- কারও প্রতি জুলুম বা অবহেলা করা যাবে না
যদি কেউ মনে করে সে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তার জন্য একাধিক বিয়ে করা নিষিদ্ধ।
হাদিসে কঠোর সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ
উচ্চারণ: মান কা-নাত লাহু ইমরাআতানি ফা-মা-লা ইলা ইহদাহুমা জা-আ ইয়াওমাল কিয়ামাতি ওয়া শিক্কুহু মা-ইল।
অর্থ: যে ব্যক্তির দুই স্ত্রী আছে, আর সে একজনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, সে কিয়ামতের দিন অর্ধেক শরীর বাঁকা অবস্থায় উঠবে।
ভালোবাসা নয়, ন্যায়বিচারই মূল ভিত্তি
ইসলামে ভালোবাসা বা আবেগ সব স্ত্রীর মধ্যে সমান হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কারণ তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু ব্যবহারিক অধিকার—খাবার, বাসস্থান, সময় ও যত্ন—এগুলোতে সমতা রক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি কোনো অবাধ স্বাধীনতা নয়, বরং কঠোর শর্ত, দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের ভারে বাঁধা একটি বিধান। সামর্থ্য ও ইনসাফ রক্ষার ক্ষমতা না থাকলে একাধিক বিয়েকে উৎসাহ দেওয়া হয়নি, বরং এক স্ত্রীতেই সন্তুষ্ট থাকতে বলা হয়েছে।
আরটিভি/জেএমএ



