ইসলামের ইতিহাসে এমন একজন নারীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, যিনি শুধু রোগীদের সেবাই করেননি, বরং চিকিৎসা ও মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি হলেন রুফাইদাহ আল-আসলামিয়া, যাকে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সেবিকা বা নার্স হিসেবে সম্মান করা হয়।
সপ্তম শতকে মদিনায় মসজিদে নববীর পাশে একটি সাধারণ তাঁবুতে অসুস্থ ও আহত মানুষের সেবা করতেন রুফাইদাহ। ক্ষত পরিষ্কার করা, ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া, রোগীদের যত্ন নেওয়া এবং তাদের মানসিকভাবে সাহস জোগানো ছিল তার দৈনন্দিন কাজ।
রুফাইদা আল-ইসলামিয়াকে নিয়ে গবেষণা করেছেন মুস্তাফা এম. বৌদ্রাক, মুতলাক বি. আল-মুতাইরি, ফাতিমা এস. আল-সুলামী এবং হিশাম এম. আল-ফায়াদ। তাদের গবেষণার তথ্য সৌদি সরকারের গেজেট ও অন্যান্য তথ্য এবং ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, খাজরাজ গোত্রের বনু আসলাম শাখায় জন্ম নেওয়া রুফাইদাহ একজন চিকিৎসকের কন্যা ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মদিনায় একটি চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে প্রথম চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
যুদ্ধের সময় আহত সাহাবিদের চিকিৎসার জন্য তিনি ‘খাইমাহ আল-রুফাইদাহ’ নামে একটি ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রও গড়ে তোলেন। বদর, উহুদ, খন্দক ও খায়বারের যুদ্ধে আহতদের সেবায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী ইতিহাসে বর্ণিত আছে, খন্দকের যুদ্ধে গুরুতর আহত সাহাবি সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-কে চিকিৎসার জন্য সরাসরি রুফাইদাহর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
রুফাইদাহ শুধু চিকিৎসক বা সেবিকা ছিলেন না, তিনি মানবসেবা, মমতা ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন দক্ষ সংগঠকও। নারীদের চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি একটি সেবিকা দল গড়ে তুলেছিলেন। তার নেতৃত্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা যুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের সেবা দিতেন। অনেক গবেষকের মতে, এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সেবিকা বা নার্স প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবায় নিয়োজিত এসব নারীকে দেখে মহানবী (সা.) এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তিনি তাদের যোদ্ধাদের সমান গণিমতের অংশ প্রদান করেছিলেন। এটি ছিল তাদের অবদানের বিশেষ স্বীকৃতি। ইসলামের ইতিহাসে এটি ছিল নারীদের সেবাকর্মের বিরল স্বীকৃতি।
রুফাইদাহ দরিদ্র, এতিম, শিশু ও অসহায় মানুষের চিকিৎসায় বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি নিজের সম্পদ ব্যয় করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও করেছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদ তাকে বিশ্বের প্রথম ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা ও মানবিক চিকিৎসা কার্যক্রমের পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আজও তার মানবসেবা, চিকিৎসা ও ত্যাগের অনন্য অবদান বিশ্বজুড়ে স্মরণ করা হয়। বিভিন্ন দেশে তার নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেবাখাতে বিশেষ অবদানের জন্য প্রতিবছর তার নামাঙ্কিত পুরস্কারও দেওয়া হয়।
আরটিভি/জেএমএ



