পবিত্র কোরআন মুসলমানদের কাছে আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ ওহি, জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ বিধান এবং সর্বাধিক সম্মানিত গ্রন্থ। এটি কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়; বরং বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নাজিল হওয়া মহাসম্মানিত কিতাব। পবিত্র কোরআন সংরক্ষিত রয়েছে লাওহে মাহফুজে, যেখানে কোনো পরিবর্তন বা বিকৃতি সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা এ কিতাবকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং কোরআনে উল্লেখ করেছেন যে, এটি পবিত্র কিতাব, যা পবিত্র সত্তাগণ স্পর্শ করেন। এ কারণেই কোরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের দাবি। ইচ্ছাকৃতভাবে কোরআন অবমাননা করা বা পুড়িয়ে ফেলা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জঘন্য, মহাপাপ এবং ভয়াবহ অপরাধ। এ বিষয়ে কোরআন, হাদিস ও ইসলামী আলেমদের বক্তব্য অত্যন্ত কঠোর।
কোরআনের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা
মহান আল্লাহ বলেন—
إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ فِي كِتَابٍ مَكْنُونٍ لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ
উচ্চারণ: ইন্নাহু লা কুরআনুন কারীম। ফী কিতাবিম মাকনূন। লা ইয়ামাসসুহু ইল্লাল মুতাহহারূন। তানযীলুম মিন রাব্বিল আলামীন।
অর্থ: "নিশ্চয়ই এটি এক মহাসম্মানিত কোরআন। যা সংরক্ষিত কিতাবে রয়েছে। পবিত্র ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করে না। এটি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।"
(সুরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত ৭৭-৮০)
কোরআনের অবমাননাকারীদের জন্য কঠিন সতর্কবার্তা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي آيَاتِنَا لَا يَخْفَوْنَ عَلَيْنَا
উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা ইউলহিদূনা ফি আয়াতিনা লা ইয়াখফাওনা আলাইনা।
অর্থ: "যারা আমার আয়াতের ব্যাপারে বিকৃতি, অবজ্ঞা বা অবমাননার পথ অবলম্বন করে, তারা আমার কাছ থেকে কখনো গোপন থাকতে পারবে না।"
এরপর আল্লাহ বলেন—
أَفَمَنْ يُلْقَى فِي النَّارِ خَيْرٌ أَمْ مَنْ يَأْتِي آمِنًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ
উচ্চারণ: আফামাই ইউলকা ফিন নারি খাইরুন আম্মাই ইয়াতি আমিনাই ইয়াওমাল কিয়ামাহ।
অর্থ: "যে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, সে কি উত্তম, নাকি যে কিয়ামতের দিন নিরাপদ অবস্থায় উপস্থিত হবে?"
(সুরা ফুসসিলাত, আয়াত ৪০)
মুফাসসিরদের (যিনি তাফসীর বা পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ প্রদান করেন) মতে, এখানে আল্লাহর আয়াত নিয়ে অবজ্ঞা, বিকৃতি ও অবমাননার ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে।
কোরআনকে উপহাস করতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা
মহান আল্লাহ বলেন—
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
উচ্চারণ: কুল আবিল্লাহি ওয়া আয়াতিহি ওয়া রাসূলিহি কুনতুম তাস্তাহযিউন। লা তা'তাযিরু কাদ কাফারতুম বা'দা ঈমানিকুম।
অর্থ: "বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত এবং তাঁর রাসুলকে নিয়ে উপহাস করছিলে? অজুহাত দিও না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছো।"
(সুরা আত-তাওবা, আয়াত ৬৫-৬৬)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর আয়াতকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপহাস বা অবমাননা করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ।
কোরআনের সম্মান রক্ষার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
ذَٰلِكَ وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ
উচ্চারণ: যালিকা ওয়া মাই ইউ'আজ্জিম শাআইরাল্লাহি ফা ইন্নাহা মিন তাকওয়াল কুলুব।
অর্থ: "যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান রক্ষা করে, তা হৃদয়ের তাকওয়ারই পরিচয়।"
(সুরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৩২)
আলেমদের মতে, কোরআন আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর একটি। তাই এর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অংশ।
হাদিসে কোরআনের মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
উচ্চারণ: খাইরুকুম মান তা'আল্লামাল কুরআনা ওয়া আল্লামাহু।
অর্থ: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)
আরেক হাদিসে এসেছে—
اقْرَؤُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ
উচ্চারণ: ইকরা'উল কুরআন, ফা ইন্নাহু ইয়াতি ইয়াওমাল কিয়ামাতি শাফিঈআন লি আসহাবিহি।
অর্থ: "তোমরা কোরআন তিলাওয়াত করো। কারণ কিয়ামতের দিন কোরআন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৪)
কোরআন পোড়ানোর শাস্তি কি কোরআন বা হাদিসে নির্দিষ্ট করা হয়েছে?
কোরআন ও সহিহ হাদিসে কোরআন পোড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট দুনিয়াবি শাস্তি আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোরআনকে অপমান, অবজ্ঞা বা ইসলামকে বিদ্রূপ করার উদ্দেশ্যে কোরআন পোড়ায়, তাহলে তা ইসলামী আকিদা অনুযায়ী অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ এবং অনেক ফকিহ এটিকে কুফরি কাজ হিসেবে গণ্য করেছেন। এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইসলামী রাষ্ট্রে বিচার হবে এবং বিচারক শরিয়তের নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করবেন। এটি ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয় নয়।
পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোরআন পোড়ানো কি নিষিদ্ধ?
না। যদি কোনো কোরআনের কপি এতটাই পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে তা আর ব্যবহারযোগ্য না থাকে, তাহলে সম্মান রক্ষার উদ্দেশ্যে তা দাফন করা বা নিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়িয়ে ছাই সংরক্ষণ বা দাফন করা ইসলামী আলেমদের কাছে বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে।
এর অন্যতম দলিল হলো, খলিফা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) কোরআনের একক মানক নকল সংরক্ষণের জন্য ভিন্ন কপিগুলো সম্মানজনকভাবে পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৮৭)
এটি অবমাননার জন্য নয়; বরং কোরআনের বিশুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
মুসলমানের করণীয় কী?
ইসলামে কোরআনের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাই একজন মুসলমানের উচিত—
১. কোরআন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অবস্থায় রাখা।
২. নিয়মিত তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।
৩. কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
৪. কোরআনের অবমাননা থেকে নিজে বিরত থাকা এবং অন্যদেরও বিরত থাকতে উৎসাহিত করা।
৫. কোনো অবমাননার ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে বৈধ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদ জানানো।
কোরআন মুসলমানদের ঈমান, জীবন ও পথপ্রদর্শনের উৎস। তাই এর সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। একই সঙ্গে ইসলামের শিক্ষা হলো—আল্লাহর বিধান ও রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা, বিচার নিজের হাতে তুলে না নেওয়া এবং সব পরিস্থিতিতে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও ন্যায়বিচারের পথ অনুসরণ করা।
আরটিভি/জেএমএ




