ফের লোডশেডিং, অতিষ্ঠ মানুষ

মিথুন চৌধুরী

বুধবার, ২৪ মে ২০১৭ , ০৭:২৫ পিএম


ফের লোডশেডিং, অতিষ্ঠ মানুষ

গ্রীষ্মের তাপে পুড়ছে জনজীবন। হাঁসফাঁস করছে মানুষ। দিনে যেমন রোদের প্রতাপ, রাতে তেমন গরম হাওয়া। গেলো কয়েক দিনে যেমন বেড়েছে গরমজনিত রোগব্যাধী তেমন বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। ফলে চাকরিজীবী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং শিশু-বৃদ্ধ সবাই গরম ও তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি মাসে অতিমাত্রায় লোডশেডিংয়ে দেখা দিয়েছে চাপা ক্ষোভ। তবে রাজধানীসহ প্রধান প্রধান শহরে লোডশেডিং অপেক্ষাকৃত কম। তারপরও দিন-রাত মিলিয়ে তিন থেকে চারবার লোডশেডিং হচ্ছে অনেক এলাকায়। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না থাকায় গ্রামাঞ্চলে কম বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে। ফলে সেখানে লোডশেডিং বেড়েছে। দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। রাতে আসে আর যায়।

আরটিভি অনলাইনের ঢাকা বিভাগ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, সিলেট, খুলনা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্নস্থানের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, গেলো কয়েকদিন ধরে খবি বেশি লোডশেডিং এর কবলে পড়ছে এ সব অঞ্চল। দিনেও রাতে সমান তালে বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করছে। বিশেষ করে পৌর শহর গুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট কম হলেও গ্রামাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ থাকেনা বললেই চলে।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক (জনসংযোগ) সাইফুল হাসান চৌধুরী বলেন, হঠাৎ করে গরম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া, উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণে থাকা, অন্য বড় কেন্দ্রগুলোও চালু হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা কমেছে।

বিজ্ঞাপন

সাইফুল হাসান চৌধুরী বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে গেলো ১ মে আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ ২৩ হাজার ভোল্টের সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারটি ভেঙ্গে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিবহনে বেশ সমস্যা হচ্ছে।  

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বড়পুকুরিয়া, ঘোড়াশাল, বিবিয়ানা, মেঘনাঘাট, আশুগঞ্জে ৫০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। পাশাপাশি প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে চট্টগ্রামে ৯০০ মেগাওয়াটের বদলে ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। ফলে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতিতে রয়েছে বলে জানালেন চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উৎপাদনের সহকারি পরিচালক মনিরুজ্জামান।

পিডিবির হিসেবে বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দৈনিক ৮ হাজার ৮০০ থেকে নয় হাজার মেগাওয়াট। তবে দেশে উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ১৩ হাজার ১৭৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ভারত থেকে আসছে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। 

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়াম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন জানান, তাদের বিদ্যুতের চাহিদা দৈনিক চার হাজার ৮০৭ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে দুই হাজার ৭৬১ মেগাওয়াট। ঘাটতি থাকছে দুই হাজার ৪৬ মেগাওয়াট। এতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে জনরোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এরইমধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয়ে বিদ্যুৎ সচিবকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

পাওয়ার সেলের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল জ্বালানি গ্যাস। গ্যাস দিয়ে উৎপাদন হয় ৬৭ ভাগ বিদ্যুৎ। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশ কমেছে। তেল দিয়ে উৎপাদন হয় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ। বাকিটা কয়লা ও জলবিদ্যুৎ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সোমবার জানিয়েছেন, বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে ঘাটতি থাকায় এই মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়া যাচ্ছে না। এটা হতে আরো ৩-৪ বছর লেগে যাবে। তবে আগামি ৪-৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে সঞ্চালন লাইন মেরামত করতে ৬ থেকে ৭ মাস লাগবে।

পাওয়ার সেলের সবশেষ তথ্য মতে, দেশে ৩ লাখ ৯৩ হাজার বিতরণ লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা গ্রহণ করছেন ২ কোটি ৪২ লাখ গ্রাহক। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কলকারখানা, মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং চোরাই সংযোগেবিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে বেশ। এগুলো হিসেব না থাকায় উৎপাদনের সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পাম্পগুলো চালু না থাকায় রাজধানীসহ দেশের পৌর শহরগুলোতে বেশ পানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে তীব্র গরমে পানি সংকটে পড়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে ডায়রিয়ায় ভুগছেন।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমছে। বারবার বিদ্যুৎ যাওয়া আসায় যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি বাসা বাড়িতে নষ্ট হচ্ছে টিভি-ফ্রিজ। ফলে দেশের বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জনরোষ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করতে দেখা যায়।

তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এবারের পুরো রমজানজুড়ে গরম থাকবে। এতে সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর যে অবস্থা তাতে রমজানে সরকারের টার্গেট অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াট করা সম্ভব হবে না। এতে রোজাদারদের ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে। ইফতারি, তারাবি ও সেহেরির সময় চাহিদা বেড়ে গেলে গ্রামের লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করবে। দুর্বল বিতরণ লাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেই বিভিন্ন স্থান লাইন ও ট্রান্সফরমার জ্বলে যাবে। এতে মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে।

জ্যৈষ্ঠের শুরুতেই গরমের তীব্রতার সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ সঙ্কট। বাড়ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, আমাশয় প্রভৃতি রোগও। গেলো ৩ দিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৫শ’র বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়া মঙ্গলবার হিটস্ট্রোকে মারা গেছে তিন জন।

এদিকে বুধবার ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবার ঢাকায় সূর্যোদয় ভোর ৫টা ১২ মিনিটে এবং বুধবার সূর্যাস্ত সন্ধ্যা ৬টা ৩৯ মিনিটে।

এমসি/জেএইচ

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission