বাংলাদেশ জুড়ে বইছে দাবদাহ। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে প্রতিবারই সারা দেশের মধ্যে যশোরের তাপমাত্রা সবার চেয়ে বেশি থাকে অথবা চুয়াডাঙ্গার পারদ থাকে শীর্ষে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও চুয়াডাঙ্গা ও যশোর দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড বারবার নিজের ঝুলিতে পুরছে। কেন এই নির্দিষ্ট অঞ্চল দুটি প্রতি বছর এমন ভয়াবহ দাবদাহের কবলে পড়ে, তা নিয়ে আবহাওয়া বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এর পেছনে রয়েছে তিনটি কারণ।
১. বিস্তৃত সমভূমি ও তাপ পরিবহনের প্রভাব
যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও আশপাশের অঞ্চলগুলো মূলত বিস্তৃত সমভূমি। এই বিস্তীর্ণ ভূপ্রকৃতি তাপ ধরে রাখার জন্য দারুণ কার্যকর। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলের পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অবস্থিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলটিও সমতল হওয়ায় সেখান থেকে উত্তপ্ত বাতাস অবাধে বাংলাদেশের এই সীমান্তে প্রবেশ করতে পারে।
বিজ্ঞানের ভাষায় তাপ তিনটি প্রক্রিয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়ায়। তাপ পরিবহন, পরিচলন ও বিকিরণ—এই তিন প্রক্রিয়াই যশোর ও চুয়াডাঙ্গার সমভূমিতে সমানভাবে কাজ করে। ফলে সরাসরি সূর্যের তাপে ভূপৃষ্ঠ দ্রুত উত্তপ্ত হয়। বাধা পাওয়ার মতো পাহাড় বা বড় কোনো বনাঞ্চল না থাকায় এই উত্তাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র দাবদাহের সৃষ্টি করে।
২. বঙ্গোপসাগর থেকে আগত আর্দ্র বায়ু
গরমের তীব্রতা অনুভূত হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের দিকে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর আর্দ্র বাতাস দেশের ভেতরে প্রবেশ করে। এই বাতাস যখন গরমের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা ভ্যাপসা গরমের সৃষ্টি করে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে একই তাপমাত্রা আরও বেশি গরম অনুভূত হয়।
এর মানে হলো, যদি কোনো স্থানে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে, তবে বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে সাধারণ মানুষের সেটি ৪১ বা ৪২ ডিগ্রির মতো গরম মনে হতে পারে। যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় এই আর্দ্রতা ও তাপের মিশ্রণটিই মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
৩. সময়কাল ও সূর্যের অবস্থান
এপ্রিল মাস বাংলাদেশে বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময় হিসেবে পরিচিত। এই সময়ে সূর্যের কিরণ উত্তর গোলার্ধে অনেকটা লম্বভাবে পড়ে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল এই সময় সরাসরি সৌর তাপ গ্রহণ করে। পৃথিবীর কক্ষপথে সূর্যের অবস্থানের কারণে এই মাসে তাপের তীব্রতা অনেক বেশি থাকে। ফলে দিনের বড় একটা সময় সূর্যরশ্মি সরাসরি ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করার সুযোগ পায়, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
শীতকালের বিপরীত চিত্র
প্রকৃতির এক অদ্ভুত বৈচিত্র্য দেখা যায় এই অঞ্চলটিতে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, যে যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় গ্রীষ্মকালে দেশের সবচেয়ে বেশি গরম পড়ে, শীতকালে আবার তারাই হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে শীতল অঞ্চল। এর পেছনেও রয়েছে ভৌগোলিক কারণ। শীতের সময় সাইবেরিয়া থেকে আসা শুষ্ক ও হিমেল হাওয়া দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে। এই বাতাসের পথেই পড়ে যশোর ও চুয়াডাঙ্গা। যার ফলে শীতকালে অনেক সময় এই অঞ্চলে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়।
আরটিভি/এআর



