জুন মাসের শুরুতেই দেশজুড়ে তীব্র গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৩ জুন) দেশের ৪৮টি জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। চলতি বছরে একসঙ্গে এতগুলো জেলায় তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম। সাধারণত মে মাসের শেষ দিকে দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ ঘটলেও এবার বর্ষা আসতে দেরি হওয়ায় গরমের তীব্রতা ও বিস্তৃতি আরও বেড়েছে।
তবে এর মধ্যেই কিছুটা স্বস্তির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু টেকনাফ উপকূল পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারে। এর ফলে শুক্রবার (৫ জুন) থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়বে। রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চলতি মাসে সামগ্রিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। তবে শুক্রবার থেকে তাপপ্রবাহের বিস্তৃতি ও তীব্রতা কমতে শুরু করতে পারে। অন্যদিকে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের মতে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যেতে পারে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশ দেরি। এরপর ধীরে ধীরে দেশজুড়ে বৃষ্টিপাত বাড়বে।
তবে আবহাওয়া অফিস সতর্ক করে বলেছে, বৃষ্টি শুরু হলেও সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরবে না। কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় ভ্যাপসা গরমের অনুভূতি আরও কয়েক দিন বজায় থাকতে পারে। তবে আগামী পাঁচ দিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা ক্রমাগত বাড়বে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সব মিলিয়ে দেশের এই অস্বস্তিকর গরম আরও অন্তত দুই থেকে তিন দিন স্থায়ী হতে পারে এবং সপ্তাহের শেষে তাপপ্রবাহের তীব্রতা কমতে শুরু করবে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, গত ২ জুনের তাপপ্রবাহের মানচিত্রে দেশের অধিকাংশ জেলা হলুদ ও কমলা রঙে চিহ্নিত রয়েছে। এর অর্থ হলো দেশের এক বিশাল অঞ্চলে ৩৬ থেকে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বিরাজ করছে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় মাঝারি তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এ ছাড়া ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন তাপপ্রবাহের আওতায় রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের তীব্র গরমের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মৌসুমি বায়ুর দেরিতে প্রবেশ। সাধারণত বর্ষা শুরু হলে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে এবং বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা দ্রুত কমে আসে। কিন্তু এখনো মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারায় সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করছে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ এবং বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প মানুষের অস্বস্তি চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার(৪ জুন) সকাল ৬টায় ঢাকার আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৮৬ শতাংশ। বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারছে না, ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় গরমের অনুভূতি বা ফিলস-লাইক অনেক বেশি হচ্ছে।
এর পাশাপাশি বৈশ্বিক আবহাওয়াগত প্রভাব এবং নগরাঞ্চলের ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপ প্রভাবও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দ্রুত বাড়ছে। এল নিনোর কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে।
অন্যদিকে ঢাকা শহরের মতো বড় নগরগুলোয় কংক্রিটের স্থাপনা, পিচঢালা রাস্তা, সবুজায়নের তীব্র ঘাটতি এবং যানবাহন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে নির্গত গরম বাতাস শহরের তাপমাত্রাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে রাতেও নগরবাসীর তেমন স্বস্তি মিলছে না।
আরটিভি/এআর



