নৃশংসভাবে শিক্ষিকা খুন, হাতে পাওয়া চুল ঘিরে রহস্য

আরটিভি নিউজ

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬ , ১১:২৬ এএম


নৃশংসভাবে শিক্ষিকা খুন, হাতে পাওয়া চুল ঘিরে রহস্য
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার পল্লবী এলাকা থেকে ফিরোজা খানম জোসনা নামে ৬৮ বছর বয়সী এক স্কুলশিক্ষিকাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মাথা ও মুখ থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

তবে নিহতের মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে একটি লম্বা কালো চুল পাওয়া গেছে। ওই চুল ঘাতকের কি না, তা নিশ্চিত হতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। চুরি-ডাকাতির কোনো আলামত না পাওয়ায় সাবলেটসহ ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাই এখন সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনের চুলের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে পল্লবীর ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর ভাড়া বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা-পুলিশ।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই ফিরোজ আলম বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেছেন। তিনি বলেন, ফিরোজা খানমের সঙ্গে ৪০ বছর ধরে তার যোগাযোগ ছিল না। কে বা কারা তার শত্রু ছিল, তা জানা নেই। এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে তার সুনাম ছিল। সবাই তাকে ভালো জানত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সহকর্মীরা জানান, পল্লবী এলাকায় হলি ক্রিসেন্ট আইডিয়াল স্কুলে শিক্ষকতা করতেন ফিরোজা খানম। করোনাকালীন সময়ে স্কুলের চাকরি ছেড়ে টিউশনি শুরু করেন। প্রায় ২৫ বছর আগে পারিবারিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তবে সেই সংসার ভেঙে যাওয়ার পর তিনি একাই বসবাস করতেন। পরিবারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলেও সাক্ষাৎ হতো খুব কম। পল্লবীর ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটে গত ১৫ বছর ধরে ভাড়া থাকতেন তিনি। তিন কক্ষের ওই ফ্ল্যাটের দুটি কক্ষ সাবলেট দিয়ে নিজে একটি কক্ষে থাকতেন। মাঝখানে ছোট একটি ডাইনিং স্পেস, পাশে রান্নাঘর ও একটি বাথরুম রয়েছে। ওই ফ্ল্যাটের দুটি কক্ষ সাবলেট নিয়ে মুন্সি রাজু আহমেদ নামের এক মুদি দোকানি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন।

বাড়ির দারোয়ান আব্দুল মান্নান বলেন, তিনি ২০১০ সাল থেকে এ বাড়িতে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আসার কিছুদিন আগে ফিরোজা খানম এই বাসায় ওঠেন। নিহত হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে তিনি বাসায় ফেরেন। একটি কক্ষ নতুন করে সাবলেট ভাড়া দেওয়ার জন্য তিনি নোটিশ দিয়েছিলেন। সেই নোটিশ দেখে একজন ভাড়াটিয়া বাসা দেখতে আসেন। নোটিশে দেওয়া নম্বরে বারবার ফোন করেও সাড়া না পেয়ে তিনি বিষয়টি দারোয়ানকে জানান। পরে দারোয়ান দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখেন ফ্ল্যাটের দরজা খোলা এবং ভেতরে রক্তাক্ত অবস্থায় ফিরোজা খানমের মরদেহ পড়ে আছে। পরে প্রতিবেশীদের জানানো হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয় এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

সাবলেট ভাড়াটিয়া মুন্সি রাজু আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি মাগুরা সদরের বেরইল ইউনিয়নের বেরইল পলিতায়। জরুরি কাজে ১৬ এপ্রিল ভোরে পরিবারসহ গ্রামে যান। ১৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকায় ফেরার পথে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ফোনে জানতে পারেন, ফিরোজা খানম খুন হয়েছেন এবং বাসায় পুলিশ এসেছে। বাসায় ফিরে দেখেন, পুলিশসহ অনেক মানুষ ভিড় করছে।

তিনি আরও বলেন, ফিরোজা আপা কখনো বাকি রাখতেন না। সকালে কিছু নিলে বিকেলে দাম পরিশোধ করতেন। তিনি নিজেই রান্না করতেন। তবে তিনি কোথায় পড়াতেন বা টিউশনি করতেন, তা তারা জানতেন না।

হলি ক্রিসেন্ট আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জাবেদ আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, করোনার সময় ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত ফিরোজা খানম তাদের স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। পরে দেখা হলে তিনি কখনো বলতেন মিরপুরে একটি কলেজে পড়ান, আবার কখনো কোচিং সেন্টারে পড়ানোর কথা বলতেন।

সহকর্মীরা জানান, ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়ে তিনি খুব বেশি কিছু জানাতেন না। স্বামীর বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে ক্যাডেট কলেজে পড়ে বলেও জানাতেন। তবে সহকর্মীরা কখনো তাদের দেখেননি।

সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতুড়ি ও রক্তমাখা ওড়না উদ্ধার করা হয়েছে। মাথার বাম পাশে ও মাঝখানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা থেঁতলানো ও রক্তাক্ত। থুতনিতেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গলা ও মুখের কাছে চিকন রশির মতো একটি ফিতা পাওয়া গেছে, যা রক্তে ভিজে গাঢ় হয়ে ছিল। মরদেহের পাশ থেকেই রক্তমাখা হাতুড়ি উদ্ধার করা হয়।

ময়নাতদন্তের সময় দেখা যায়, ভুক্তভোগীর এক হাতের মুষ্টিতে কিছু চুল শক্ত করে ধরা ছিল। এই চুলের সূত্র ধরেই হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার বলেন, শিক্ষিকা ফিরোজা হত্যার ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় বিভিন্ন তথ্য সামনে আসছে, সেগুলো যাচাই করে তদন্ত চলছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগীর হাতে পাওয়া চুলের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে, তবে কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। দ্রুতই আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission