২২ দিনে দেশে ৪ বার ভূমিকম্প: কীসের ইঙ্গিত?

আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬ , ০২:০০ এএম


২২ দিনে দেশে ৪ বার ভূমিকম্প: কীসের ইঙ্গিত?
ছবি: সংগৃহীত

চলতি জুন মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত চার দিনে অন্তত ৬ দফা ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠায় সাধারণ মানুষের মনে কাজ করছে বড় ধরনের আতঙ্ক। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন এই ছোট ছোট কম্পন বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে।

২২ জুন (আজকের সর্বশেষ কম্পন)

সবশেষ আজ সোমবার (২২ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা। ঢাকা ও এর চারপাশের বাসিন্দারা এই ভূকম্পন স্পষ্ট টের পান। তাৎক্ষণিকভাবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও, রাতের এই হঠাৎ কম্পনে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

১৮ জুন (মণিপুর সীমান্ত)

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাত ৯টা ২৯ মিনিটে আরও একটি মৃদু ভূমিকম্প রেকর্ড করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৩৬১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে ভারতের মণিপুর এলাকায়।

আরও পড়ুন

১১ জুন (শিলচর সীমান্ত)
 
তারও এক সপ্তাহ আগে, ১১ জুন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে দেশজুড়ে আরও একটি কম্পন অনুভূত হয়। ইউরোপীয় মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৫। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের করিমগঞ্জ সীমান্তবর্তী ভারতের শিলচরে, যার গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকার কিছু কিছু জায়গায় এটি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল।

৭ জুন (ভুটান কেন্দ্র)
 
চলতি মাসে ভূমিকম্পের এই ধারাবাহিকতা শুরু হয় গত ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ওই মাঝারি ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশ ভুটানে। ভুটানের থিম্পু থেকে উত্তর-পূর্বে আঘাত হানা ওই ভূমিকম্পের প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে ঢাকাসহ দেশের মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রবল ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে। অনেকেই সে রাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।

স্বস্তির বিষয় হলো, এই ৪টি ভূমিকম্পের কোনোটিতেই বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৪ বার ভূকম্পনে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
 
বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে?

চলতি বছরে দেশে আরও কয়েক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিত ধারাবাহিক কম্পন নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার এক সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি বলেছিলেন, ‌বাংলাদেশে ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটি— উত্তরের ডাউকি ফল্ট এবং পূর্ব দিকে সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাহাড়ে বিস্তৃত সাবডাকশন জোন। এখানে মূলত বার্মা প্লেটের নিচে ইন্ডিয়া প্লেটটি তলিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বৈজ্ঞানিক পরিমাপে দেখা গেছে, এই সংযোগস্থলে বর্তমানে ৮.২ থেকে শুরু করে প্রায় ৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করার মতো বিশাল শক্তি জমা হয়ে আছে!

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানান, সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো এই ফল্ট লাইনটি বর্তমানে পুরোপুরি ‘লকড’ বা আটকে আছে। কোনো স্লিপ বা ছোটখাটো মুভমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘ দিন ধরে এই শক্তি অবমুক্ত হচ্ছে না। শক্তি বের না হয়ে প্রতিনিয়ত জমা হতে থাকাটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ঙ্কর অবস্থা।

তিনি জানান, বাংলাদেশ নিজে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা না হলেও, এই লকড কন্ডিশনের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। তাই এখানে যখনই কোনো বড় ভাঙন হবে, তা প্রলয়ঙ্করী রূপ নেবে।

ঘন ঘন ভূমিকম্প কি কিয়ামতের আলামত?
 
বড় কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে বহুতল ও দুর্বল ভবনগুলোর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কিছু করার থাকে না। তবে সঠিক কৌশল জানা থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং জীবনহানি নূন্যতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব।

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার সতর্ক করেন যে, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে বহুতল ভবন থেকে নিচে নামা বা রাস্তায় জড়ো হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। বরং ঘরের ভেতরেই ‘ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড’ পদ্ধতি মেনে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেওয়া উচিৎ।

বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নিয়মটি আমাদেরও কঠোরভাবে মেনে চলা দরকার বলে মনে করেন তিনি। পদ্ধতিটি হলো—

ড্রপ: কম্পন শুরু হওয়া মাত্রই আতঙ্কিত হয়ে না দৌড়ে যেখানে আছেন সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ুন।
কাভার: ঘরের ভেতরে থাকা শক্ত টেবিল, খাট, সোফা সেট বা বিমের নিচে অবস্থান নিন এবং মাথার ওপর হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় সুরক্ষিত রাখুন।
হোল্ড: কম্পন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই শক্ত আশ্রয়টি হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখুন, যেন ঝাঁকুনিতে আপনি ছিটকে না যান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সংস্থাগুলো বড় বাজেটের মধ্যম বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, যেখানে বাণিজ্যের সুযোগ বেশি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ১ শতাংশেরও কম খরচে তাৎক্ষণিক ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা করা।

অধ্যাপক হুমায়ুনের মতে, তরুণদের প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ‘ন্যাচারাল হ্যাজার্ড গেম’ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ডিজিটাল গেম তৈরি করে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করা সম্ভব। 

এর মাধ্যমে মানুষ খেলার ছলে শিখবে ঘরে, রাস্তায়, অফিসে বা রাতে ভূমিকম্প হলে কার কী করণীয়। একই সাথে প্রতিটি ওয়ার্ড বা মহল্লায় নিয়মিত সাইরেন বাজিয়ে ভূমিকম্পের মহড়া করা উচিত। এতে মানুষের মানসিক মনোবল তৈরি হবে এবং বড় দুর্যোগেও মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

আরটিভি/এসআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission