জাসাস নেতাকে কুপিয়ে হত্যার নেপথ্যে জমি নিয়ে বিরোধ, অভিযোগ বাবার

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৩:৫২ পিএম


জাসাস নেতাকে কুপিয়ে হত্যার নেপথ্যে জমি নিয়ে বিরোধ, অভিযোগ বাবার
ছবি: সংগৃহীত

গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকারকে (৪১) জমিসংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই ফারুক হোসেন ৬ জনের নাম উল্লেখ করে শ্রীপুর থানায় মামলা রুজু করেছেন। 

বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুরে তার বাড়িতে নিহতের বাবা জামাল উদ্দিন সরকার সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির আহমদ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, মৃত্যুর আগে ফরিদ স্থানীয় মেম্বারকে মুঠোফোনে বলে গেছে তাকে হত্যাকারী তারা ডাকাতের নাম। মেম্বার পুলিশকে তারা ডাকাতের কথা বললেও পুলিশ এখনো পর্যন্ত তারা ডাকাতকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

জাসাস নেতা ফরিদ সরকার শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের নারায়নপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন সরকারের ছেলে। তিনি গোসিংগা ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক। তাকে হত্যার ২/৩ দিন আগে থেকে তিনি লতিফপুর গ্রামের কে বি এম ব্রিক্স (ইট খলায়) মাটি সরবরাহের কাজ দেখভাল করতো।

অভিযুক্তদের মধ্যে প্রধান আসামি পাশের কাপাসিয়া উপজেলার সূর্য নারায়নপুর (ভুবনেরচালা) গ্রামের মৃত বিল্লাল হোসেনের ছেলে তারা ডাকাত (৪০), শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের নারায়নপুর গ্রামের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে আনোয়ার (৫০), মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে হালিম (৫৫), মৃত আব্দুস শাহিদের ছেলে মোতাহার মাস্টার (৬০), সেলিমের ছেলে হৃদয় হাসান জয় (২০) এবং মৃত মমতাজ উদ্দিনের ছেলে টিটু (২৫)। ঘটনার পর থেকে আসামীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

নিহতের বাবা জামাল উদ্দিন সরকার জানান, আমাদের ভোগদখলীয় ৮ বিঘা জমি নিয়ে আসামি আনোয়ারের সঙ্গে দীর্ঘ ৩/৪ বছর যাবত জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে। ওই জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আসামী আনোয়ার ১৬ নভেম্বর রাতে জামাল উদ্দিন সরকার ও তার বড় ছেলে ফারুক হোসেনকে বাড়ীর পাশে পেয়ে হত্যার হুমকি দেয়। এ ঘটনায় তার ছেলে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার পরদিন ১৭ নভেম্বর বাবা ও বড় ভাইয়ের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে শ্রীপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। জিডি করার পর পুলিশ কোনো ধরনের কার্যক্রম বা তৎপরতা দেখায়নি। পুলিশ জিডির গুরুত্ব দিলে আজকে আমার ছেলেকে এভাবে জীবন দিতে হতো না। আসামিরা জমিসংক্রান্ত বিষয়ে পূর্ব বিরোধের জেরে এবং পরিকল্পিতভাবে তারা ডাকাতকে ভাড়া করে আমার ছেলেকে মুঠোফোনে ইট খলায় ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।

গোসিংগা ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার খোরশেদ আলম রফিক (৫৮) বলেন, জাসাস নেতা ফরিদ সরকার মৃত্যুর আগে মুঠোফোনে আমাকে বলেছে ‘তারা ডাকাত’ তাকে কুপিয়ে ডান হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তারা ডাকাতকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই জাসাস নেতাকে হত্যার প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসবে। তারা এলাকার চিহ্নিত ডাকাত। তার নামে একাধিক মামলা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কে বি এম ব্রিকসের ম্যানেজার (ব্যবস্থাপক) অজিত সরকার তাকে ফোন করে জানায় ফরিদ সরকারকে দুর্বৃত্তরা ইট খলায় কুপিয়ে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে। এ সময় আহত ফরিদ সরকার ম্যানেজারের কাছ থেকে ফোন নিয়ে মেম্বারকে বলে ভাই আমাকে মারধর করে আমার হাত কেটে ফেলেছে। কারা তোমাকে কুপিয়েছে জিজ্ঞাসা করলে বেলে ‘তারা ডাকাত’ আমাকে কুপিয়েছে। ফরিদের বাবাকে জানালে তিনি (ফরিদের বাবা) কে বি এম ব্রিকসে গিয়ে দেখেন ফরিদ মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। পরে তাকে উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফরিদকে মৃত ঘোষণা করে।

মামলার বাদী নিহতের বড় ভাই ফারুক হোসেন (৪৫) বলেন, আমাদের গ্রামের স্থানীয় মেম্বার খোরশেদ আলম রফিককে মৃত্যুর আগে ফোন করে ফরিদ তাকে হত্যাকারী তারা ডাকাতের নাম বলে গেছে। মেম্বার সাহেব পুলিশকে একাধিকবার এ কথা জানানোর পরও আমার ভাই ফরিদকে হত্যার ৩০ ঘণ্টা পরও তারা ডাকাতকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তারা আমার ভাই হত্যার প্রধান আসামী। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হত্যার সঠিক কারণ জানা যাবে।

শ্রীপুর উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) আহবায়ক হেলাল প্রধান বলেন, জাসাস নেতা ফরিদ সরকারকে হত্যার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশ একজন আসামি ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আসামিরা তাকে মুঠোফোনে ইট খলায় ডেকে নিয়ে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করব দ্রুত সময়ের মধ্যে চিহ্নিত খুনিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান বলেন, বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) ভোরে নারায়নপুর গ্রাম থেকে আসামি টিটুকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ঘটনার পরপরই অন্যান্য আসামিরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। তারা ডাকাতের নামে পূর্বে থানায় একাধিক কোনো ধরনের মামলা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন গোসিংগা এলাকার লোকজনের মুখে শুনেছি সে ‘তারা ডাকা’ এলাকার চিহ্নিত ডাকাত এবং পূর্বে ডাকাতিসহ এলাকায় বিভিন্ন অপকর্ম করেছে। তার পিসিপিআর (ব্যক্তিগত ডাটা) এখনো দেখিনি, তবে দেখতে হবে।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির আহমদ জানান, কে বি এম ব্রিকসের ম্যানেজার (ব্যবস্থাপক) অজিত সরকার (৪৫), ইট ভাটা শ্রমিক মিনারুল (২০), নাহিদ হাসান (১৮), উসমান (২১), জাকির হোমেন (১৮), আগুন মিস্ত্রি শফিকুল ইসলামকে (৪০) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। স্থানীয় ইউপি সদস্যর জিম্মায় তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মেরাজুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ক্লু পেয়েছে এবং সেই ক্লু অনুযায়ী আমরা এগোচ্ছি। আশার করছি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদেরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারবে।

প্রসঙ্গত, বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) ভোর ৪টার দিকে গোসিংগা ইউনিয়নের লতিফপুর গ্রামের কে বি এম ব্রিক্স (ইট খলায়) আসামিরা জাসাস নেতা ফরিদ সরকারকে রাম দা এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে।


আরটিভি/এএএ 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission