স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসে এক নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এমন খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধানে ধর্ষণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকার ধামরাইয়ে ১৫ জানুয়ারি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবরটি ভাইরাল হয়। ভুক্তভোগী হিসেবে যাকে উল্লেখ করা হয়েছে সেই নারী ও তার কথিত স্বামী দুজনেই জানিয়েছেন, সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেখানে যা ঘটেছে তা হলো ছিনতাই। পুলিশও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা পায়নি।
এ ঘটনায় মামলার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান। গ্রেপ্তাররা হলেন- জিয়োস চন্দ্র মনি দাস (৩০), শ্রী চরণ (৫০), সুভন (৩০) ও দিপু চন্দ্র মনি দাস (৪৫)। তারা ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশ জানায়, ২৩ জানুয়ারি রামরাবন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আসামি জিয়োস চন্দ্র মনি দাসের কাছ থেকে ১৫০০ টাকা, শ্রী চরণের কাছ থেকে ২২৫০ টাকা, শুভনের কাছ থেকে ২৩২০ টাকা ও দিপু চন্দ্র মনি দাসের কাছ থেকে ২৫৬০ টাকাসহ মোট ৮,৬৩০ টাকা উদ্ধার করা হয়। তদন্তে তারা এই ঘটনায় জড়িত বলে জানা যায়। এরমধ্যে শ্রী চরণের বিরুদ্ধে ধামরাই থানায় পূর্বের মাদক মামলা রয়েছে।
কি ঘটেছিল সেদিন, জানালেন ভুক্তভোগী
এসব বিষয়ে কথা হয় আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাতে ঘুমিয়ে থাকার সময় তারা দরজায় ধাক্কা দেয়। দরজা খুলে দেওয়ার পরপরই তারা বারান্দার লাইট বন্ধ করে দেয় এবং ঘরের ভেতরে ঢুকে ভেতরের লাইটও বন্ধ করে দেয়।
আমি পরে আবার একটি লাইট জ্বালাই। তখন তারা আমার মানিব্যাগে থাকা মোবাইল ফোন ও বেতনের টাকা নিয়ে নেয়। আমার কাছে আনুমানিক ২১ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা ছিল। টাকা-পয়সা নেওয়ার সময় তারা আমাকে মারধর শুরু করে।
ভয়ের কারণে আমি বলি যে আমার বান্ধবী আমার স্ত্রী। তখন তারা আমার বান্ধবীকে বলে, 'তুই কি তোর স্বামীকে চাস, না এগুলো চাস?' তখন আমার বান্ধবী বলে, 'আমি আমার স্বামীকে চাই।'
এরপর তারা আমার বান্ধবীকে ঘরের বাইরে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে বলে, তোর স্বামীকে যদি চাস, তাহলে এগুলো খুলে দে। তখন তারা আমার বান্ধবীর নাকফুল, কানের দুল, প্রায় আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন এবং তার ব্যবহৃত ভিভো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেয়।
সবকিছু নিয়ে তারা চলে যাওয়ার পর আমি কৃষ্ণদাসকে ডাকতে যাই। পরে কৃষ্ণদাস এলে তাকে বিস্তারিত জানাই। এরপর আমি ও আমার বান্ধবী কৃষ্ণদাসের বাড়িতে যাই। পরদিন সকালবেলা আমরা যার যার গন্তব্যে চলে যাই।
তবে সেখানে ধর্ষণ ও খুঁটিতে বেঁধে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি। এছাড়া অভিযুক্তরা কোন ধর্মের সেটিও তিনি জানেন না। তিনি বলেন, আমি কাউকেই চিনি না। তবে দেখলে চিনতে পারবো। যেহেতু চিনি না, তারা কোন ধর্মের তাও জানি না।
ছিনতাই কাণ্ডে ধর্ষন গুজব
১২ জানুয়ারি দিবাগত রাতের ওই ছিনতাইকাণ্ডের প্রায় এক সপ্তাহ পরে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, ঢাকার ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে হিন্দু বাড়িতে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক মুসলিম গৃহবধূ।
এই ঘটনায় মূলত দুটি অভিযোগ তোলা হয় সংবাদমাধ্যমে। প্রথমটি, বেড়াতে এসে ছিনতাই ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মুসলিম গৃহবধু। আর দ্বিতীয় অভিযোগ, ছিনতাই ও ধর্ষণকারীরা হিন্দু ধর্মের অনুসারী।
এই খবর প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। ‘একদল হিন্দু পুরুষ দ্বারা একজন মুসলিম গৃহবধু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন’- এই কথার জেরে অনলাইন এক্টিভিস্টদের অনেকে ঘটনাটিকে নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তবে আরটিভির প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওইদিন সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ জানেন না। এমনকি যে নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে তার স্বামী বলে পরিচয় দেয়া ব্যক্তিটিও আরটিভিকে বলেন, তার ‘স্ত্রী’ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে তার জানা নেই এবং এমন কথা তিনি কাউকে বলেননি।
এছাড়া ঘটনার অল্পক্ষণ পরই প্রতিবেশি যারা ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছিলেন তাদের কেউ ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে জানেন না। ভুক্তভোগী স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদ্বয়ও তখন তাদেরকে ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোনো তথ্য দেননি। এবং তাকে খুঁটিতে বেঁধে মারধর করার যে তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে তা অস্বীকার করেন আব্দুর রাজ্জাক। স্থানীয়রাও খুঁটিতে বেঁধে মারধরের কোনো ঘটনা শোনেননি বলে সংবাদমাধ্যমটিকে জানান।
আরটিভিকে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিনতাইয়ের ঘটনা নিশ্চিত করেন। তবে ধর্ষণের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে তিনি কোনো তথ্য নিশ্চিত করেননি।
ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, রামরাবন এলাকার ঘটনায় ভুক্তভোগী মামলা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত ও অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের রিমান্ডে চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।
আরটিভি/এমআই




