বসন্তের ফাল্গুনি হাওয়ায় নড়াইলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন কেবলই হলুদের সমারোহ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই হাসছে সূর্যমুখী। এক সময় যা ছিল কেবল শৌখিন বাগান কিংবা বাড়ির আঙিনার শোভাবর্ধক ফুল, আজ তা নড়াইলের কৃষকদের কাছে হয়ে উঠেছে এক অর্থকরী ফসল। ভোজ্যতেলের উত্তরোত্তর মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে কম খরচে অধিক লাভের আশায় জেলার চাষিরা এখন ব্যাপকভাবে ঝুঁকছেন সূর্যমুখী চাষে। সরিষার চেয়ে দ্বিগুণ লাভের হাতছানি আর প্রকৃতির অপরূপ ছোঁয়ায় নড়াইলের কৃষি অর্থনীতিতে সূচিত হয়েছে এক নতুন দিগন্ত।
নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর ইউনিয়নের চাঁচড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক মুগ্ধকর দৃশ্য। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ফুটে থাকা হাজারও সূর্যমুখী যেন প্রকৃতিতে বিছিয়ে দিয়েছে এক বিশাল সোনালি গালিচা। ফাল্গুনের মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া এই হলুদ ফুলগুলো কেবল সৌন্দর্যই ছড়াচ্ছে না, ছড়াচ্ছে সাধারণ কৃষকের স্বচ্ছলতার ঘ্রাণও। শুধু চাষি নয়, এই নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরাও ভিড় করছেন মাঠের কিনারে।
সরেজমিনে কথা হয় স্থানীয় সফল কৃষক কামরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, গত বছর আমি অল্প জমিতে চাষ করে বেশ ভালো ফলন ও দাম পেয়েছিলাম। সেই সাহস থেকেই এবার বড় পরিসরে আবাদ করেছি। এটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল। সঠিক সময়ে সারিবদ্ধভাবে বীজ রোপণ ও সামান্য পরিচর্যা করলেই ফলন দুর্দান্ত হয়। সরিষার চেয়ে সূর্যমুখীতে শ্রম ও খরচ দুটোই কম, কিন্তু লাভ হবে প্রায় দ্বিগুণ। মাঠের অবস্থা দেখে বুক ভরে যাচ্ছে।
ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা যখন সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে, ঠিক তখনই নড়াইলে সূর্যমুখী হয়ে উঠেছে এক সম্ভাবনাময় বিকল্প। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইল সদর উপজেলায় সূর্যমুখী চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। গত বছর যেখানে আবাদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৫ হেক্টর, সেখানে চলতি মৌসুমে তা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ হেক্টরে। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এই আবাদ কৃষকদের আগ্রহের স্পষ্ট প্রতিফলন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান এই সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। সূর্যমুখী চাষে যেমন উৎপাদন খরচ কম, তেমনি এর তেলের পুষ্টিগুণ সাধারণ তেলের চেয়ে অনেক বেশি। হৃদরোগীদের জন্য এই তেল অত্যন্ত উপকারী। চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ফলন আশাতীত হবে। আমরা আশা করছি, এই সাফল্য দেখে ভবিষ্যতে জেলার আরও বহু প্রান্তিক কৃষক এই ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন।
কম পরিশ্রমে অধিক মুনাফা আর প্রকৃতির আশীর্বাদে নড়াইলের এই সূর্যমুখী চাষ এখন জেলার কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হওয়ার পথে।
স্থানীয় অর্থনীতিবিদ সিহাব শেখের মতে, সূর্যমুখীর চাষাবাদ বৃদ্ধি পেলে একদিকে যেমন ভোজ্যতেলের আমদানি-নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠবে তেল নিষ্কাশন শিল্প। এই উজ্জ্বল হলুদ ফুলেই লুকিয়ে আছে আগামীর এক উজ্জ্বল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
আরটিভি/এমএইচজে




