বেড়িবাঁধের বাহিরে জনমানবহীন এলাকা হাতিয়া জংঙ্গলিয়া খালের শুটকি পল্লী। সারা বছর নীরব নিস্তব্ধ থাকলেও হঠাৎ সরগরম। জেলে, ব্যাপরাী, শ্রমিক ও চা দোকানিদের হাঁকডাকে দিন রাত ২৪ ঘন্টা জাঁকজমক থাকে এই জনপদ।
কেওড়া বাগানের পাশে বিশাল এলাকাজুড়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। বাগান থেকে শুরু করে নদী পর্যন্ত ৪-৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বড় বড় স্তুপ করে রাখা শুটকি। সবাই যার যার শুটকি স্তুপ নিয়ে ব্যাস্ত। কেউ পরিমাপ করছে, কেউ বিলের মধ্যে শুকাতে দেওয়া শুটকি স্তুপ করছে। আবার অনেকে পরিমাপ করে করে বস্তায় বিশেষ কায়দায় প্যাকেট করছেন শুটকি। নোয়াখালী হাতিয়ার জাহাজমারা ৬ নং ওয়ার্ডের জংঙ্গলিয়ার খালের শুটকি পল্লীর চিত্র এটি।
দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার প্রায় ২ লাখ লোক জেলে পেশার সাথে জড়িত। এর মধ্যে অনেকে ১২ মাস নদীতে থেকে বর্ষায় ইলিশ মাছ ও শুকনো মৌসুমে ছেউয়া মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। গত কয়েক বছর ইলিশের আকাল থাকায় ব্যবসায়ী হিসাবে মন্দা যাচ্ছে তাদের শুটকি বাজার। তবে এই বছর পর্যাপ্ত চেউয়া মাছ পাওয়ায় তা পুশিয়ে ভালো লাভের মুখ দেখছেন অনেকে।
হাতিয়ার চার পাশে নদী। তবে তুলনামূলক দক্ষিণ পাশে চেউয়া মাছ বেশি পাওয়া যায়। এজন্য দক্ষিণ পাশের ঘাটগুলো চেউয়া মাছ ও শুটকি উৎপাদনে সরগরম থাকে। এর মধ্যে কাদিরা ঘাট, বুড়িরদোনা ঘাট, রহমত বাজার ঘাট, আচকা বাজার ঘাট, কাজির বাজার ঘাট, বন্দরটিলা ও নিঝুমদ্বীপ নামার বাজারসহ ১০টি ঘাটে সব চেয়ে বেশি শুটকি উৎপাদন হয়। গত কয়েক বছরের তুলনায় এই বছর চেউয়া মাছ বেশি পাওয়ায় জেলেরা শুটকি বিক্রি করে ভালো লাভ করেছে।
হাতিয়াতে চেউয়া মাছের জন্য সবচেয়ে বড় ঘাট হলো জাহাজমারা জংগলিয়ার ঘাট। এখানে ছোট-বড় ১০০- ১২০টি জেলে নৌকা রয়েছে। প্রতিটি নৌকায় থাকেন একজন মাঝি ও ৩০-৩৫ জন করে জেলে।
জাহাজমারা জংগলিয়া ঘাটের প্রবীণ মাঝি জসিম উদ্দিন জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এই বছর চেউয়া মাছ বেশি দেখা গেছে। ইতোমধ্যে এক একটি নৌকা ৩৫-৪০ লাখ টাকা করে শুটকি বিক্রি করে আয় করেছে। প্রতিমণ শুটকি বিক্রি হচ্ছে ৩হাজার টাকা ধরে। তার মালিকানা নৌকাটি গত সপ্তাহে ১৫শত মন শুটকি বিক্রি করেছে।
এর আগে মৌসুমের প্রথমে দুই ঝোতে (দুই কাটাল)পাওয়া ১৫ শত মণ বিক্রি করে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। খরচ বাদে হিসাবে এখন পর্যন্ত এক একজন বাগি (জেলে) প্রায় ৭০ হাজার টাকা করে পেয়েছে বলে জানান জসিম মাঝি।
জসিম মাঝি আরও জানান, শুধু জংগলিয়ার ঘাটে জেলেরা এক মৌসুমে শুটকি বিক্রি করে আয় করে ৫০ কোটি টাকারও উপরে। এই বছর আয়ের এই অংক আরো বৃদ্ধি পাবে বলে তার আশা।
শুটকি উৎপাদনকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও বেড়ির বাহিরে বন বিভাগের বাগান ঘেষে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার জাহাজমারা ৭ নং ওয়ার্ডের জংগলিয়ার ঘাটে বেড়িবাঁধের বাহিরে চরের মধ্যে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার। একই চিত্র বুড়িরচর বুড়িরদোনা ঘাটের দক্ষিনে এম আলী লালচরে। অস্থায়ী এসব বাজার মূলত শুটকি উৎপাদনে নিয়োজিত জেলে ও ব্যাপারীদের ঘিরে গড়ে উঠেছে। এখানে চায়ের দোকান, মুদি দোকান, জ্বালানী তৈল ও ইঞ্জিনের পার্টস বিক্রি করা হয়।
মোহাম্মদ আলী সুইজ ঘাটের খালের উপারে চতলার উপরে একটি শুটকির স্তুপ ঘিরে অনেকের জটলা লেগে আছে। কাছে গিয়ে দেখা যায় ২০-২৫ শ্রমিক মেপে মেপে শুটকি বস্তায় প্যাকিং করছেন। এই স্তুপের মালিক জাহাজমারা নতুন সূখচর গ্রামের কাইয়ুম মাঝি।
কাইয়ুম মাঝি জানান, স্তুপে থাকা শুটকি ৩হাজার ২০০ টাকা ধরে বিক্রি করছি। এখন মাপার কাজ চলছে। আনুমানিক ৬শত মণের মতো হবে। হিসাবে যার মূল্য হয় প্রায় ২০ লাখ টাকার মত।
কাইয়ুম মাঝি আরও জানান, দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়ে গেছে। এক একটি ঝোতে (কাটালে) ৬-৭দিন নদীতে থাকা লাগে। তাতে প্রতিদিন ২০-২২ হাজার টাকা খরচ হয়। এক মাসে (৩০দিনে) দুই বার এই ঝো (কাটাল) পাওয়া যায়। তখন নদীতে প্রচুর চেউয়া মাছ পাওয়া যায়। ঝো ছাড়া মাসের অন্য সময় বেকার ঘাটে বসে থাকতে হয়।
হাতিয়ার শুটকির সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হলো ময়মনসিংহ। এছাড়াও বরিশাল, চট্রগ্রাম ও কুমিল্লা কিছু শুটকি বিক্রি হয়। তবে তুলামূলক ময়মনসিংহ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় শুটকি। এই শুটকি দিয়ে তৈরি হয় মাছের খাদ্য, মুরগির খাদ্যসহ বিভিন্ন উপকরণ।
হাতিয়াতে বিভিন্ন ঘাটে শুটকির বড় ব্যাপারী রয়েছে ১৫-২০ জনের মত। এর মধ্যে জংগলিয়া ঘাটের বড় ব্যাপারী হলো আবুল বাসার (৫০)।
আলাপ কালে বাসার জানান, মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চার ধাপে শুটকি মোকামে পাঠিয়েছি। এতে প্রথম ধাপে পাঠিয়েছেন ৩হাজার ৩শত ৬০ মণ। অন্য তিন ধাপে প্রায় ৭হাজার মণ মোকামে পাঠিছেন। মোট হিসাবে এসব শুটকি বিক্রি করে পাওয়া গেছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। মৌসুমের প্রথমে শুটকির মূল্য কম থাকলেও এখন তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এব্যাপারে হাতিয়া জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, চেউয়া সুটকি উৎপাদনে হাতিয়াতে ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। এই উপজেলায় এই বছর প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন শুটকি উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখানকার শুটকি বিক্রি করা হয়। তবে উন্নত যাতায়াত ও শুটকি তৈরিতে আরও সহজ উপায় ব্যবহার করতে পারলে জেলেদের এই মাছ ও শুটটি বিক্রি করে আরও বেশি লাভবান হতে পারে।
আরটিভি/এমএম




