গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানার উত্তর বনমালা এলাকায় নিজ ঘর থেকে ছেলের ও পাশের রেল লাইনের পাশ থেকে বাবার মরদেহ উদ্ধার ও হত্যার ঘটনায় মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ।
এক খালাতো বোনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ত্রিভুজ প্রেমের জেরে বড় ভাই সাইফুর রহমান সোহান (২৮) এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) টঙ্গী পূর্ব থানার দায়িত্বশীল সূত্র এই সংবাদ নিশ্চিত করেন। এর আগে রোববার ভোরে স্থানীয় বনমালা এলাকায় বাবা ও ছেলের দুটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতরা হলেন, টঙ্গীর উত্তর দত্তপাড়া বনমালা প্রাইমারী স্কুল রোডের মোস্তফা দর্জির ছেলে মো. সোহেল (৪৮) ও তার ছেলে সাকিবুর রহমান শোয়েব (১৭)।
এই ঘটনায় আটক নিহত সোহেলের বড় ছেলে সাইফুর রহমান সোহান (২৭)। নিহত শোয়েব রাজধানীর উত্তরায় একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে পড়াশোনার পাশাপাশি ঢাকার তেঁজগায়ে বেঙ্গল ফুড নামে একটি দোকানে চাকরিও করতেন। আটক সাইফুর রহমান একটি ঔষুধ কারখানায় কাজ করতেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত সাকিবুর রহমান শোয়েব (১৭) তার থেকে ১০ বছর বয়সে বড় খালাতো বোনের সঙ্গে গোপনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং বিয়ে করতে চায়। এতে বড় ভাই সাইফুর রহমান সোহান (২৭) বাধা দেয়। কারণ সোহানের সঙ্গে ওই খালাতো বোনের বিয়ের কথা চলছিল। এই নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। এই বিরোধে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের বাবা। ঘটনার রাতে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সোহান তার ছোট ভাই সাকিবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাকিবের মুখ চেপে ধরে এবং হাত-পা বেঁধে ধারালো ব্লেড দিয়ে হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় সোহান। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর সে সাকিবের বাঁধন খুলে দিয়ে ঘটনাটি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে।
সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ড চলাকালীন পাশের কক্ষে থাকা বাবা সোহেল রানা (৫০) বিষয়টি দেখে ফেলেন। আতঙ্কিত সোহান তখন বিষয়টি ধামাচাপা দিতে একজন সহযোগীকে সাথে নিয়ে তার বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে বনমালা রেললাইনে নিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। অন্ধকারে দুইজন ব্যক্তি একজন দুর্বল মানুষকে ধরে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সেই ব্যক্তি ছিলেন সোহেলের বাবা।
সূত্র জানায়, ফুটেজে আরও দেখা যায়, রেললাইনের ওপর তাকে ফেলে রেখে দ্রুত সরে যায় তারা। কিছু সময় পর ট্রেনের নিচে পড়ে মৃত্যু হয় তার। এটি দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যা-তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য সোহান আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে জানায় যে, তার বাবা মাদকের টাকার জন্য ছোট ভাইকে খুন করে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এরপর পুলিশ গিয়ে দুটি লাশ উদ্ধার করে ও সন্দেহজনকভাবে সোহানকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এই অবস্থায় গতকাল রাতে নিহত সোহেলের বোন শিরিন সুলতানা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে একটি হত্যা মামলা করেন। আসামিকে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে। আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিবে বলে আমাদের জানিয়েছেন।
টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, নারী সংক্রান্ত ঘটনায় এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছোট ভাইকে হত্যার পর তার বাবা মাদকে আসক্ত থাকায় সহজেই তাকে রেললাইনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় আসামি। আমরা আশা করছি, আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানানো হবে।
আরটিভি/এমএম




