চট্টগ্রামের একটি বাসা থেকে পাচারের জন্য আনা তিনটি মহাবিপন্ন প্রজাতির চশমাপরা হনুমান উদ্ধার করেছে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ডিভিশন।
রোববার (৩ মে) রাতে খুলশি থানার হাই লেভেল রোডের একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে প্রাণীগুলোকে উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ডিভিশনের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ লুতফর পারভেজ বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারি, হাই লেভেল রোডের একটি বাসায় পাচারের জন্য কিছু বন্যপ্রাণী রাখা হয়েছে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে সেখানে অভিযান চালাতে গেলে প্রথমে বাধার সম্মুখীন হই। পরে পুলিশের সহায়তায় বাসায় প্রবেশ করে তল্লাশি চালিয়ে তিনটি চশমাপরা হনুমান উদ্ধার করি।
তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে একটি প্রাপ্তবয়স্ক হনুমান খাঁচায় বন্দী ছিল। অন্য দুটি বাচ্চা প্লাস্টিকের ঝুড়িতে রাখা ছিল। বর্তমানে এগুলো আমাদের হেফাজতে আছে এবং যত্ন নেওয়া হচ্ছে। তিনটিই সুস্থ রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাসাটি বন্যপ্রাণী পাচারকারী জগলুরের বলে জানা গেছে। তবে অভিযানের সময় সে বাসায় ছিল না। আমাদের সঙ্গে নারী কর্মকর্তা না থাকায় বাসায় থাকা এক নারীকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা যায়নি। পরে নারী কর্মকর্তা পৌঁছানোর আগেই তিনি পালিয়ে যান।
হনুমান পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে জগলুকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পাচারের উদ্দেশ্যেই হনুমানগুলো ওই বাসায় আনা হয়েছিল।
চশমাপরা হনুমান বিষয়ে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক জোহরা মিলা জানান, দেশের উত্তরপূর্ব জেলার বনভূমি লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি, পাবলাখালি ও কাপ্তাই বনে চশমাপরা হনুমানের বাস। এদের গায়ের রং মেটে বা কালচে বাদামি। পেট ও বুকের রং কিছুটা সাদাটে। এই হনুমানের বাচ্চা দেখতে সাদা, গোলাপি আর বাদামির মিশ্র রঙের। কালো মুখমণ্ডলে পূর্ণবয়স্ক হনুমানের শুধু চোখের চারদিকে সাদা, দেখলে মনে হয় যেন চশমা পরে আছে। এরা খুবই লাজুক স্বভাবের। এরা কখনও গাছ থেকে মাটিতে নামে না। তাছাড়া মানুষ দেখলেই পালিয়ে যায়। তাই দল বেঁধে চলাফেরা করলেও সহসা এদেরকে চোখে পড়ে না। চশমাপরা হনুমান গাছের কচি পাতা, ফুল, ফল, বীজ, কীটপতঙ্গ, পাখির ডিম খেয়ে জীবনধারণ করে।
তিনি বলেন, প্রতি দুই বছরে স্ত্রী হনুমান মাত্র একটি বাচ্চা দেয়। ফলে এদের বৃদ্ধির হার খুব কম। পাশাপাশি আবাসস্থল সংকট এবং চোরা শিকারিদের কারণে চশমাপরা হনুমান আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০০৮ সালে বিশ্বে বিপন্ন এবং ২০১৫ সালে বাংলাদেশে চশমাপরা হনুমানকে মহবিপন্ন প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭৪ এবং বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। তাই এটি শিকার, হত্যা বা এর কোনো ক্ষতি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
চশমাপরা হনুমান দেশের একটি মহাবিপন্ন প্রজাতি। ইংরেজিতে এটি Spectacled Langur, Phayre's Langur বা Phayre's Leaf Monkey নামে পরিচিত। কালো হনুমান বা কালা বান্দর নামেও পরিচিত এ প্রাণীর কালো মুখমণ্ডলের চোখের চারপাশে সাদা দাগ থাকায় দেখতে চশমা পরা মনে হয়। Cercopithecidae গোত্রভুক্ত এ প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম Trachypithecus phayrei। দেশের তিন প্রজাতির হনুমানের মধ্যে আকারে এরা সবচেয়ে ছোট এবং সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে এদের বসবাস।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
আরটিভি/এমএ




