চট্টগ্রামের টেরিবাজারে হেনস্থার শিকার নারী ক্রেতারা; উদাসীন ব্যবসায়ী সমিতি

দেবাশীষ মল্লিক, আরটিভি নিউজ

বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ , ০৭:১৬ পিএম


চট্টগ্রামের টেরিবাজারে হেনস্থার শিকার নারী ক্রেতারা; উদাসীন ব্যবসায়ী সমিতি
ছবিতে প্রদর্শিত টেরিবাজারের দোকানটিতে নারী হেনস্থা ও হয়রানির ঘটনা ঘটে গত ১৯ মে। ভুক্তভোগী নারী নিজের মুঠোফোনে দোকানের ছবিটি সংগ্রহ করে রাখেন।

‘এগুলো এখানে সাধারণ ঘটনা, কোনো ব্যাপার না’ — সম্প্রতি চট্টগ্রামের টেরিবাজার বাণিজ্যকেন্দ্রে এক দোকান কর্মচারীর হাতে হয়রানি ও হেনস্থার শিকার হওয়া একজন নারী ক্রেতা তার ভাইয়ের মাধ্যমে টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে অভিযোগপত্র জমা দিতে গেলে সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা এমন মন্তব্য করেন এবং তারা অভিযোগপত্রটি গ্রহণ না করে ভুক্তভোগী নারীর সেই ভাইকে ফিরিয়ে দেন।

নগরের কেন্দ্রস্থলে আন্দরকিল্লা থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে অবস্থিত বাণিজ্যিক কেন্দ্র টেরিবাজারে রয়েছে আড়াই হাজারটিরও বেশি দোকান এবং বিরাশিটি শপিংমল। শুধু খুচরা ক্রেতাই নন, এখানে ভিড় জমান জেলার বিভিন্ন উপজেলার পাইকারি ব্যবসায়ীরাও। অনেকের মতে, রাজধানী ঢাকার ইসলামপুরের পর এটিই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং নির্ভরযোগ্য পাইকারি কাপড় ক্রয়-বিক্রয়ের কেন্দ্র।

কিন্তু এখানেই কেনাকাটা করতে এসে ক্রেতারা, বিশেষত নারী ক্রেতারা, প্রতিনিয়তই হেনস্থা ও হয়রানির শিকার হন। বাজারের বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী বা মালিক সুযোগ পেলেই নারী ক্রেতাদের সাথে অশালীন ও আপত্তিকর আচরণ এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন বলে জানা যায়।

গত ১৯ মে, জমজমাট ঈদের বাজারের সময়েই একজন নারী ক্রেতা টেরিবাজারের এমনই এক দোকানের কর্মচারীর হাতে চরম হেনস্থা ও হয়রানির শিকার হন। পরবর্তীতে পরিচয় লুকিয়ে তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে ফেসবুকে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি গ্রুপে পোস্ট লিখলে সেখানে দেখা যায়, গ্রুপের অনেক সদস্য মন্তব্যের ঘরে এসে নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিব্রতকর ঘটনা এবং বাজারের বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী ও মালিক দ্বারা হেনস্থা, হয়রানি, এমনকি যৌন হয়রানির বিষয়ও তুলে ধরেন।

পোস্টের সূত্র ধরে ওই ভুক্তভোগী নারী ক্রেতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করেন এবং এই প্রতিবেদককে বিস্তারিত জানান। তিনি জানান, তার নাম পূজা চৌধুরী (২৬); তিনি চট্টগ্রাম নগরেরই একজন বাসিন্দা এবং পেশায় ডাক অধিদপ্তরের একজন সুপারিশপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে তিনি আরটিভিকে জানান, ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে নয়টার দিকে টেরিবাজারের ‘আজমীর শপিং সেন্টার’ নামক একটি দোকানে গজ কাপড় কিনতে যাই। দোকানের কর্মচারীর সাথে মূল্য নির্ধারণ হওয়ার পর কতটুকু কাপড় লাগবে তা নিশ্চিত না হয়েই তিনি কাপড় কেটে ফেলেন এবং আমাকে কেটে ফেলা পুরো কাপড়টি কিনতে বাধ্য করার জন্য জোর করতে থাকেন। জোরাজুরির একপর্যায়ে তিনি প্রথমে খারাপ আচরণ এবং পরে তুই-তুকারি শুরু করেন। আমি এর প্রতিবাদ করলে ওই কর্মচারী আমাকে মারতে উদ্যত হন, এমনকি জুতা নিয়েও তেড়ে আসেন। আশেপাশের সাধারণ ক্রেতা এবং কয়েকটি দোকানের অন্যান্য বিক্রেতা-কর্মচারী এসে তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও তিনি থামেননি; বরং অকথ্য-অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি আমার গায়ে হাত দেওয়ারও চেষ্টা করেন।

ভুক্তভোগী নারী আরও জানান, অবস্থা বেগতিক দেখে সাহায্য চেয়ে ‘৯৯৯’-এ ফোন দিতে মুঠোফোন বের করলে ওই কর্মচারী আমার ফোন ও সাথে থাকা ব্যাগ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং সম্ভ্রমহানির হুমকি দেন। এ সময় পাশের এক দোকানি আমাকে সহযোগিতা করেন এবং নিজের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতে বলেন, যেন আজমীর শপিং সেন্টারের ওই কর্মচারী পুনরায় কোনো অসভ্যতা করতে না পারে।

সাহায্য চেয়ে ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সহায়তা পেয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে ভুক্তভোগী নারী ক্রেতা পূজা চৌধুরী জানান, তারা আমাকে নিকটস্থ থানা অর্থাৎ চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানার ডিউটি অফিসারের সাথে কথা বলিয়ে দেন। কিন্তু অফিসার আমাকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে না এসে বলেন, আমি যেন থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করি, তখন তারা ব্যবস্থা নেবেন। ওই রকম একটা পরিস্থিতিতে আমি একা কীভাবে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করব? সাধারণত বড় বাজারগুলোতে ক্রেতাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী সমিতি বা মালিক সমিতির ফোন নম্বর দেওয়া থাকে কিংবা অন্তত একটি কার্যালয় বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তাৎক্ষণিক কারও সাহায্য পাওয়ার মতো কোনো নম্বর কোথাও ছিল না আর ওই পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে কার্যালয় খুঁজে বেড়ানোরও কোনো সুযোগ ছিল না।

আরও পড়ুন

তিনি আরও বলেন, কোনো একভাবে সেখান থেকে বের হয়ে আমি বিষয়টি আমার পরিবারের সদস্য, একাধিক বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানাই। তখনই জানতে পারি যে, এই বাজারে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। নারী ক্রেতাদের সাথে দোকানের কর্মচারী, এমনকি মালিকেরাও দুর্ব্যবহার করেন, হুমকি-ধামকি দেন এবং হেনস্থা করেন। অনেক পুরুষ ক্রেতাও সেখানে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন। আমি সরকারি চাকরির জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত একজন নাগরিক, অন্যদের তুলনায় আইন সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানি। আমাকেই যদি এভাবে হেনস্থা ও অপদস্থ হতে হয়, তাহলে সাধারণ ক্রেতাদের সাথে কী আচরণ করা হয় তা ভাবাই যায় না! পরে আমি বিষয়টি নারীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে এমন একটি স্থানীয় সংগঠনকে জানাই। তারা আমাকে থানায় একটি জিডি করার পরামর্শ দেন এবং ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বরাবর অভিযোগপত্র জমা দিতে বলেন। সংগঠনটি আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে, বিষয়টি মীমাংসা করতে ঈদের ছুটির পর সমিতির কার্যালয়ে তারা আমার সাথে যাবেন এবং দোষী কর্মচারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরবর্তীতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য সমিতির পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব উদ্যোগ গ্রহণে বাধ্য করবেন।

কোতোয়ালী থানা ও সমিতির কাছে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি দুবার নিজেই থানায় জেনারেল ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছিলাম। সেখানে কর্তব্যরত একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হয়েছে, জিডি করার বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে সমিতির কার্যালয়ে গতকাল (মঙ্গলবার) আমার এক ভাইকে দিয়ে অভিযোগপত্রটি পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা সেটি গ্রহণ তো করলেনই না, উল্টো আমার ভাইকে বললেন—‘এগুলো এখানে সাধারণ ঘটনা, কোনো ব্যাপার না’। দেশে যেখানে নারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে বিভিন্ন মহল সোচ্চার, ইভটিজিং ও ধর্ষণবিরোধী বিভিন্ন প্রচারণা চলছে, সেখানে টেরিবাজারের দায়িত্বশীলদের কাছে নারী ক্রেতার হেনস্থা হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা! আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি, যেন পরবর্তীতে আর কোনো নারী ক্রেতা এভাবে হেনস্থা বা হয়রানির শিকার না হন।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত নারী হেনস্থার ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপ জানতে বুধবার (২৭ মে) চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানার ডিউটি অফিসারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, পূজা চৌধুরী জিডি করে থাকলে তার রেকর্ড থানায় থাকবে এবং একটি কপি তাকেও দেওয়া হবে। তবে শুধু অভিযোগ করলে কোনো স্থায়ী রেকর্ড থাকে না। জিডি বা অভিযোগ যা-ই করা হোক না কেন, পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়।

তবে এই মুহূর্তে রেকর্ড না দেখে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয় জানিয়ে এবং ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করে কর্তব্যরত ওই কর্মকর্তা প্রতিবেদককে ফোন কেটে দেওয়ার অনুরোধ করেন।

টেরিবাজার বাণিজ্যকেন্দ্রটি ‘টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতি’র নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই এই বিষয়ে সমিতির কার্যালয়ের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে কথা হয় সভাপতি আব্দুল মান্নানের সাথে। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, আমি ওই নারী ক্রেতার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ইতিমধ্যে জানতে পেরেছি। এখন ঈদের ছুটি চলে এসেছে। ছুটির পর মার্কেট খুললে আমি উনাকে অভিযোগপত্রসহ ডাকব।

গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করা হবে জানালে তিনি বলেন, অবশ্যই বিষয়টি গণমাধ্যমে আসতে পারে। আমাদের পক্ষ থেকে এতে কোনো সমস্যা নেই।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission