দেশের ‘লিচুর রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরে এখন পুরোদমে চলছে লিচুর বেচাকেনা। জেলার বিভিন্ন বাগান ও বাজারে বেদানা, মাদ্রাজি, চায়না-৩ এবং বোম্বাই জাতের লিচুর ব্যাপক সরবরাহ দেখা যাচ্ছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা সরাসরি বাগান ও আড়ত থেকে লিচু সংগ্রহ করছেন। ফলন ভালো হওয়ায় এবং বাজারদর সন্তোষজনক থাকায় চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। তবে পাইকারদের মতে, আগের বছরের তুলনায় এবার লিচুর দাম কিছুটা কম।
দিনাজপুরের কালিতলা, পুলহাট, সিকদারহাট, মহব্বতপুর, উলিপুর, মাসিমপুর ও আউলিয়াপুর এলাকার বাজারগুলোতে এখন লিচুর বেচাকেনা তুঙ্গে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এসব এলাকা থেকে লিচু কিনে নিজ নিজ অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে বাগানগুলোতে নারী-পুরুষ শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা গাছ থেকে লিচু সংগ্রহ, আঁটি তৈরি এবং পরিবহনের জন্য প্যাকেটজাত করার কাজ করছেন।
দেশের সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার হিসেবে পরিচিত দিনাজপুর শহরের কালিতলা নিউ মার্কেটে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও বোম্বাই জাতের লিচুর উপস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে। বাজারে জায়গার সংকট দেখা দেওয়ায় সড়কের পাশে সারি সারি ভ্যান ও ইজিবাইকে লিচু মজুত রাখা হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি হাজার মাদ্রাজি লিচু বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকায়। বেদানা জাতের লিচুর দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা, চায়না-৩ জাতের সাত থেকে আট হাজার টাকা এবং বোম্বাই জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়।
সদর উপজেলার সিকদার গ্রামের বাগান মালিক আকরাম আলী জানান, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। বাজারমূল্যও সন্তোষজনক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে বাগান থেকেই লিচু বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
মহব্বতপুর এলাকার চাষি আব্দুল হান্নান বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগানে এসে লিচু কিনছেন। সংগ্রহের পর সেগুলো যত্নসহকারে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে।
একজন ক্রেতা জানান, তিনি বেদানা লিচু শতপ্রতি ৫০০ টাকা এবং চায়না-৩ জাতের লিচু শতপ্রতি ৮০০ টাকায় কিনেছেন। অথচ গত বছর একই পরিমাণ লিচুর জন্য যথাক্রমে ৮০০ ও ১২০০ টাকা গুনতে হয়েছিল। ফলে এ বছরের দাম নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট।
এক আড়তদারের ভাষ্য, দিনাজপুরে উৎপাদিত মোট লিচুর প্রায় ৮০ শতাংশ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। বাকি ২০ শতাংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুরে বর্তমানে পাঁচ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে পাঁচ হাজার ৪১৮টি লিচুর বাগান রয়েছে। এর মধ্যে বোম্বাই জাতের চাষ হয়েছে তিন হাজার ১৭০ হেক্টরে, মাদ্রাজি এক হাজার ১৬৬ হেক্টরে, চায়না-৩ ৮০২ হেক্টরে, বেদানা ২৯৫ দশমিক ৫ হেক্টরে, কাঁঠালি ৫৬ হেক্টরে এবং মোজাফফরপুরী এক হেক্টর জমিতে। এছাড়া জেলার বসতবাড়ি ও বাগান মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ লিচুগাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, প্রাকৃতিক কারণে এ বছর ফলন কিছুটা কম হলেও লিচুর মান অত্যন্ত ভালো হয়েছে। আকার, আকৃতি ও রঙের দিক থেকেও ফলগুলো আকর্ষণীয়। মৌসুমের শুরুতে দাম কিছুটা কম থাকলেও ধীরে ধীরে বাজার চাঙা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চাষিরা আরও ভালো দাম পাবেন।
আরটিভি/এমএইচজে




