অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে বিক্ষোভ, মহাসড়কে ২০ কিমি যানজট

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ , ০৩:৩১ পিএম


অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে বিক্ষোভ, মহাসড়কে ২০ কিমি যানজট
ছবি: আরটিভি

কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার তিনটি মৌজার নামে ইজারা নেওয়া বালুমহালের আড়ালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ অংশে মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে তারা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করলে উভয় পাশে প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজারো যাত্রী।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আশুগঞ্জ গোলচত্বরে চরসোনারামপুর গ্রামের কয়েকশ নারী-পুরুষ এই কর্মসূচি পালন করেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা মহাসড়কে শুয়ে পড়ে বিক্ষোভ করলে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের পশ্চিম পাশে মেঘনা সেতু পেরিয়ে ভৈরব পর্যন্ত এবং পূর্ব পাশে বেরতলা এলাকা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার করে মোট প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার সাদেকপুর, লুন্দিয়া ও টুকচানপুর মৌজার নামে বালুমহালের ইজারা দেওয়া হলেও বাস্তবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরসোনারামপুর সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে।

তাদের দাবি, নির্বিচারে ড্রেজিংয়ের ফলে চরসোনারামপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা, আশুগঞ্জ বাজার, আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, জাতীয় গ্রিডের ৩৩ হাজার কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটি, কৃষিজমি ও নদীতীর ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে নদীভাঙনের আশঙ্কাও দিন দিন বাড়ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চরসোনারামপুরে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। অধিকাংশই মৎস্যজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রতিবছর নদীভাঙনের কবলে পড়ে বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় থাকতে হয় তাদের। বর্তমানে গ্রামের শ্মশান, মসজিদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা শিতল চন্দ্র দাস বলেন, নদী আমাদের জীবিকার উৎস। কিন্তু অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণে এখন সেই নদীই আমাদের ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছে। যেখানে ইজারা দেওয়া হয়নি, সেখানে দিন-রাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আমরা এই অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ চাই।

আরেক বাসিন্দা বিপ্লব কুমার সূত্রধর বলেন, ড্রেজারের কারণে নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে। গ্রামের সামনে গভীর খাদ সৃষ্টি হয়েছে। শ্মশান, মসজিদ ও বসতঘর হুমকির মুখে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো গ্রাম নদীগর্ভে চলে যাবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরও ভৈরব উপজেলার নামে ইজারা নিয়ে আশুগঞ্জ অংশে সীমানা লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলন করা হয়েছিল। প্রশাসনের অভিযানের পরও এবার একই কায়দায় পুনরায় ড্রেজিং শুরু হয়েছে। ফলে নিজেদের বসতভিটা, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নেমেছেন চরসোনারামপুরের বাসিন্দারা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ৩০ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন ভৈরব উপজেলার সাদেকপুর, লুন্দিয়া ও টুকচানপুর মৌজার মেঘনা নদীর বালুমহাল ইজারা দেয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মেসার্স শফিক ট্রেডার্স-এর অনুকূলে ওয়ার্ক অর্ডারও জারি করা হয়।

আরও পড়ুন

তবে স্থানীয়দের দাবি, ইজারাভুক্ত এলাকায় পর্যাপ্ত বালু না থাকায় ইজারাদার প্রতিদিন ভোর থেকে প্রায় পাঁচটি ড্রেজার বসিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরসোনারামপুর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন করছেন।

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এই বালু উত্তোলন কার্যক্রম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তারা মানববন্ধন ও মহাসড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছেন।

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু হেনা মোস্তফা রেজা বলেন, মহাসড়ক অবরোধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পাঠানো হবে।

আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সীমানা লঙ্ঘন করে কোথাও বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু তাহের দেওয়ান বলেন, অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

উল্লেখ্য, গত বছরও আশুগঞ্জের চরসোনারামপুর এলাকায় সীমানা লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে একাধিক ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হয়। ওই সময় দায়ীদের কারাদণ্ড দেওয়া ছাড়াও সরকারি কাজে বাধা, প্রশাসনের ওপর হামলা এবং জব্দ করা ড্রেজার ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক অভিযান সত্ত্বেও এবার আবারও একইভাবে আশুগঞ্জ অংশে বালু উত্তোলন শুরু হওয়ায় পুরো এলাকা নতুন করে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission