বন্যপ্রাণীর অকৃত্রিম বন্ধু সিতেশ বাবু আর নেই

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ০৪:৩৬ পিএম


বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সীতেশ বাবু আর নেই
ছবি: সংগৃহীত (সোশাল মিডিয়ার নীতিমালা রক্ষার্থে ছবিতে থাকা প্রাণীটিকে এআই দিয়ে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব মারা গেছেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টায় শ্রীমঙ্গলে নিজ বাসস্থানে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সকালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুর ২টায় শ্রীমঙ্গলের নোয়াগ্রামে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

সিতেশ রঞ্জন দেবের জীবন যেন একটি অসাধারণ রূপান্তরের গল্প। ছোটবেলায় বাবা শিরীষ রঞ্জন দেবের সঙ্গে শিকারে যেতেন। তখন দেশে বন্যপ্রাণী শিকারে কঠোর বিধিনিষেধও ছিল না। ১৯৮৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনিও কিছুদিন শিকার করেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তার উপলব্ধি হয়, প্রকৃত বীরত্ব প্রাণ নেওয়ায় নয়, প্রাণ বাঁচানোর মধ্যেই।

আরও পড়ুন

সেই উপলব্ধিই বদলে দেয় তার পুরো জীবন। হাতে বন্দুকের বদলে উঠে আসে সেবার হাত। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

মানুষের হাতে নির্যাতিত, বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে আহত, অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় জখম কিংবা পাচারকারীদের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য বন্য প্রাণীর শেষ ঠিকানা ছিল শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।

নিজ বাড়ির ছোট্ট একটি প্রাণী সেবাকেন্দ্র থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। পরে রুপসপুরের বাগানবাড়িতে স্থানান্তরিত হয়ে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।

গত কয়েক দশকে তার হাত ধরে চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেয়ে হাজার হাজার বন্য প্রাণী সুস্থ হয়ে আবার ফিরে গেছে প্রকৃতির কোলে।

দেশের যেকোনো প্রান্তে লোকালয়ে বন্য প্রাণী ঢুকলেই বন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংগঠন কিংবা সাধারণ মানুষের প্রথম ভরসা ছিলেন সিতেশ বাবু। বন্য প্রাণী উদ্ধারে তার নিরলস পরিশ্রম, দক্ষতা ও মানবিকতা তাকে দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রাণীসেবকদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শুধু প্রাণী উদ্ধার নয়, বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং জনসচেতনতা তৈরিতেও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তার দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার দেখানো পথেই বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সেবার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মৃত্যুর আগেই তিনি নিশ্চিত করে গেছেন, এই মানবিক দায়িত্ব যেন থেমে না যায়।

সিতেশ বাবুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো শ্রীমঙ্গলে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি ডা. হরিপদ রায় বলেন, সিতেশ বাবুর মতো মানুষ যুগে যুগে জন্ম নেন না। তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন নির্বাক প্রাণীদের জন্য। তার চলে যাওয়া শুধু শ্রীমঙ্গলের নয়, পুরো দেশের অপূরণীয় ক্ষতি।

শ্রীমঙ্গল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা জহর তরফদার ও একরামুল কবির বলেন, আজ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। যে মানুষটির স্নেহ-ভালোবাসায় প্রতিদিন মুখর থাকত অসংখ্য উদ্ধার হওয়া পশুপাখি, সেই অভিভাবককে হারিয়ে যেন তারাও নিস্তেজ। খাঁচাবন্দি কিংবা চিকিৎসাধীন প্রাণীগুলোর চোখেও যেন প্রশ্ন— কোথায় আমাদের সেই সিতেশ বাবু?

সিতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেত এবং প্রকৃতিপ্রেমীরা।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission