সারাদেশে বছরে ২২০০ মিমি বৃষ্টি, চট্টগ্রামে ৭ দিনেই ১৪৫৪ মিমি

আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৫৩ পিএম


সারাদেশে বছরে ২২০০ মিমি বৃষ্টি, চট্টগ্রামে ৭ দিনেই ১৪৫৪ মিমি
চট্টগ্রামে সাতদিনেই ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড। ঘছবি: সংগৃহীত

গত এক সপ্তাহে টানা বৃষ্টিপাত অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে চট্টগ্রাম বিভাগ। ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাতদিনেই এখানে ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ রাজধানীসহ সারাদেশে বছরে গড় বৃষ্টিপাত হয় ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার। সে হিসাবে চট্টগ্রামে মাত্র এক সপ্তাহে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা দেশের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় ৬৬ শতাংশ বা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রামে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বন্যার পানি ঘরবাড়িতে প্রবেশ করায় অসংখ্য মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। গবাদিপশুর মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম বিভাগে হওয়া অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতই সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রধান কারণ বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সচিবালয়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি বিভাগে এত স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত হওয়ায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সেই জলাবদ্ধতার কারণেই পরবর্তী সময়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

তিনি জানান, গত ১২ জুলাই তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে চট্টগ্রামে সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে জলাবদ্ধতার কারণ ও চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন একটি বড় প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হলে নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, অতিবৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার। জেলার কয়েকটি স্থানে পুরোনো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও পোল্ডারের ক্ষতি হয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধের ভেতরে অতিরিক্ত পানির চাপ সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় লোকজন পানি নিষ্কাশনের জন্য বাঁধ কেটে দিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্লুইস গেটগুলো পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে।

বর্তমান নদ-নদীর পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৪ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ, সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ, সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা এবং তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানি ক্রমান্বয়ে কমছে এবং আগামী দু-একদিনের মধ্যে অধিকাংশ স্থানে পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বন্যাকবলিত এলাকায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি মেরামত ও বাঁধ সুরক্ষায় এরই মধ্যে ৭ লাখের বেশি জিওব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে এবং আরও ৬ লাখ জিওব্যাগ মজুত রয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত সেগুলো ব্যবহার করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সামনের দিনগুলোতে আবার ভারী বৃষ্টিপাত হলেও যেন নদীর বাঁধ ও মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়, সে লক্ষ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে।

আরও পড়ুন

বন্যাকবলিত কৃষকদের সহায়তায় সরকারের উদ্যোগ

সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারি জমিতে অস্থায়ী বীজতলা তৈরি করে কৃষকদের বিনামূল্যে ধানের চারা সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি গবাদিপশুর জন্য শুকনো খাদ্য বিতরণ এবং খুরা রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন এসব তথ্য জানান।

মন্ত্রী বলেন, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদ্য রোপণ করা আমন ধানের চারা। ১০ থেকে ১৫ দিন বয়সী কোমল চারা কয়েকদিন পানির নিচে থাকায় অনেক এলাকায় তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কৃষকদের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সারাদেশের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোন কৃষকের কত জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে সম্পর্কেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, আগামী দুদিনের মধ্যে বন্যাকবলিত অঞ্চলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)সহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমিতে জরুরি ভিত্তিতে বীজতলা তৈরি করা হবে। সেখানে দ্রুত ধানের বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হবে। পানি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব চারা বিতরণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেক কৃষকের জমি এখনো পানির নিচে থাকায় তারা এখনই পুনরায় রোপণ করতে পারছেন না। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই উপযুক্ত সময় পর্যন্ত চারা প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রোপণযোগ্য উপযোগী জাতের ধানের বীজ ব্যবহার করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, বন্যার কারণে কৃষকদের আরেকটি বড় সংকট হলো গবাদিপশুর খাদ্য। অনেক স্থানে খড় ও শুকনো গোখাদ্য পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। পাশাপাশি ঘাসেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গরু ও ছাগলের জন্য শুকনো খাদ্য সরবরাহ করা হবে।

তিনি জানান, বর্ষা ও বন্যার পর গবাদিপশুর মধ্যে খুরা রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আগামী দু-একদিনের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকার গবাদিপশুকে খুরা রোগের টিকা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, বন্যায় মাছ চাষিরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আকস্মিক বন্যায় অনেক পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদেরও সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কৃষক, প্রাণিসম্পদ খাত এবং মৎস্যচাষিদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। সরকারের এই উদ্যোগ সম্পর্কে মানুষ জানলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরাও সাহস পাবেন এবং দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারবেন।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission