বেশ কয়েক বছর আগেই ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীকে হারিয়েছেন। স্ত্রী আর ক্যানসারে আক্রান্ত মেয়েকে চিকিৎসা করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েও বাঁচাতে পারেননি মেয়েকেও। সব হারিয়ে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বয়স, দরিদ্রতা আর অসুস্থতা যেন একসঙ্গে চেপে বসেছে হযরত আলীর (৭০) কাঁধে। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে পা ফেলেন; কিন্তু দারিদ্র্য তাকে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেয়নি। এক ছেলে ও এক মেয়ের সংসারের ভাত জোগাতে প্রতিদিনই কষ্টের শরীর নিয়ে বের হতে হয় মিশুক (অটো) চালাতে। লাঠিতে ভর দিয়ে মিশুকে উঠা আর শেষে মিশুক চালিয়ে বাড়িতে এসে নামা। এভাবেই চলে তার জীবন। মিশুকই ছিল তার ও তার পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। আর সেই শেষ সম্বলটিও প্রতারণার মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র।
ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার কালিবাড়ী এলাকার রামচানপুর গ্রামে হযরত আলীর বাড়ি । তিনি মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে। জীবনের এই বয়সেও অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের শ্রমেই সংসার চালিয়ে আসছিলেন তিনি।
রোববার (১৯ জুলাই) প্রতিদিনের মতোই জীবিকার সন্ধানে মিশুক নিয়ে বের হন তিনি। বেলা প্রায় ১১টার দিকে কালিবাড়ী থেকে দুই ব্যক্তি তার মিশুক ভাড়া করে পাশের উপজেলার পৌর শহর মধুপুরে আসেন। হাটখোলা-বোয়ালী সেতু এলাকায় পৌঁছলে মিশুকে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কিনতে তাকে কাছেই কল্লোল সিনেমা হলের সামনের একটি দোকানে যেতে হয়।
হাঁটতে অক্ষম বৃদ্ধকে সহানুভূতির ভান করে দুই যাত্রীর একজন হাত ধরে হাটখোলা মাছবাজার হয়ে রাস্তা পার করে দেন। অসহায় মানুষটি তখনও বুঝতে পারেননি এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার অংশ। যন্ত্রাংশ কিনে বোয়ালী সেতুর উপর ফিরে এসে তিনি দেখেন—তার মিশুক নেই, নেই সেই দুই যাত্রীও। মুহূর্তেই যেন অন্ধকার নেমে আসে তার জীবনে।
একটি লাঠি হাতে সেতুর পাশে বসে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ। তিনি জানান, এই মিশুকটাই ছিল তার তিন সদস্যের সংসারের বাঁচার ভরসা। এখন কিভাবে সংসার চলবে এই ভাবনায় চিন্তিত। তিনি মিশুক চালান, ছেলে চায়ের দোকানে কাজ করেন।
বৃদ্ধের আহাজারি শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে আসেন। তারা জানান, হযরত আলীর কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না, এমনকি পরিবারের কারও ফোন নম্বরও তার জানা ছিল না। তাই স্বজনদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি।
বোয়ালী এলাকার অনেকেই মানবিক কারণে তাকে বাড়ি ফেরার ভাড়া ও কিছু আর্থিক সহায়তা দেন। একই সঙ্গে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে প্রতারকদের শনাক্ত এবং চুরি হওয়া মিশুক উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য- এমন একজন বৃদ্ধ, শারীরিকভাবে অসুস্থ ও অসহায় মানুষের সঙ্গে এই প্রতারণা শুধু একটি চুরির ঘটনা নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধেরও নির্মম অবক্ষয়ের চিত্র। মিশুকটি উদ্ধার, জড়িতদের গ্রেফতার এবং হযরত আলীর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
মধুপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) একেএম ফজলুল হক জানান, এ বিষয়ে কেউ এখনও অভিযোগ করেনি। করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএ




