শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার লিটন দেওয়ানের বিরুদ্ধে মাত্র ১০ টাকার ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের সরকারি রশিদ দিতে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীকে একটি কক্ষে আটকে রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। পরে জোরপূর্বক তার কাছ থেকে ‘কোনো টাকা নেওয়া হয়নি' এমন বক্তব্য আদায় করে ভিডিও ধারণ করা হয়।
এদিকে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ভূমি অফিস ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে জনরোষের মুখে অভিযুক্ত তহশিলদার ২০ হাজার টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাজিরা উপজেলার বাসিন্দা আজিজুল হক তার জমির নতুন অর্থবছরের ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ সংগ্রহের জন্য জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। তিনি অভিযোগ করেন, একই জমির খাজনার রশিদ নিতে প্রায় ছয় মাস আগেও তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। এবার জমি বিক্রির প্রয়োজনে নতুন রশিদ তুলতে গেলে তহশিলদার লিটন দেওয়ান বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে একপর্যায়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে রশিদ দেওয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, পরে বাধ্য হয়ে তহশিলদারের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি বিকাশ নম্বরে ২০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। সেই লেনদেনের প্রমাণ তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে উপস্থাপন করেছেন। টাকা পাঠানোর পর তাকে যে সরকারি রশিদ দেওয়া হয়, তাতে ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ সরকারি ফি উল্লেখ ছিল মাত্র ১০ টাকা।
বিষয়টি বুঝতে পেরে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন আজিজুল হক। তিনি বলেন, টাকা ফেরত চাইতেই তহশিলদার লিটন দেওয়ান ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন দালাল আমাকে একটি কক্ষে আটকে রাখে। মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে জোর করে আমার কাছ থেকে ‘কোনো টাকা নেওয়া হয়নি’— এমন বক্তব্য আদায় করে ভিডিও ধারণ করা হয়। আমি খুব দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।
অফিস থেকে বের হয়ে আজিজুল হক বিষয়টি স্থানীয়দের জানালে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিস ঘেরাও করেন। তারা অভিযুক্ত তহসিলদারকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। সোমবার (২০ জুলাই) ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত তহশিলদার দীর্ঘদিন ধরে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দিতে সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে আসছেন। বিক্ষুব্ধ জনতার চাপের মুখে একপর্যায়ে তিনি অভিযোগের ২০ হাজার টাকা ভুক্তভোগীকে ফেরত দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তহশিলদার লিটন দেওয়ান তাদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে ভূমি-সংক্রান্ত সেবা দেওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি সেবা পেতে অনেককেই একপ্রকার জিম্মি করে অর্থ আদায় করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে একাধিকবার জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলেও অভিযুক্ত তহসিলদারকে পাওয়া যায়নি। পরে পুনরায় কার্যালয়ে গেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এরপর তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
একপর্যায়ে অভিযুক্ত তহশিলদার সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সাংবাদিকদের অনৈতিকভাবে অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করারও চেষ্টা করেন। তবে সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত দায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়।
এ বিষয়ে জাজিরা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি কিছু ভিডিও দেখেছি এবং সাংবাদিকদের মাধ্যমেও ঘটনাটি শুনেছি। ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তহশিলদারকে তলব করে তার বক্তব্য নেওয়া হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ঘটনায় জয়নগর ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ হয়রানি ও অনিয়মের শিকার না হন।
আরটিভি/এমএইচজে




