বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলার সীমান্তে সশস্ত্র কুকি-চিন তৎপরতার কারণে দেশত্যাগের পর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রত্যাবর্তনকারী বম পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ১২টি গ্রামের ৩০০-এর অধিক বম, ম্রো ও ত্রিপুরা সদস্যকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা দিয়েছে বান্দরবান রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
বান্দরবান রিজিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের ব্যবস্থাপনায় বাকলাইপাড়া আর্মি ক্যাম্পের আওতাধীন পাড়াবাসীর কাছে দুটি চাঁদের গাড়ি হস্তান্তর করা হয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি, জুমচাষ, ফল উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে পরিবহন সংকট এবং বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড তথা বান্দরবান রিজিয়নের সরাসরি তৎপরতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আস্থা, সম্প্রীতি ও টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চাঁদের গাড়িগুলো রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, কৃষিপণ্য ও ফলমূল বাজারজাতকরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল বহন এবং জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিনের পরিবহন সংকট কাটিয়ে এই উদ্যোগ তাদের জীবনযাত্রা সহজ করবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে।
স্থানীয় জনগণ আরও আশা প্রকাশ করেন, চাঁদের গাড়িগুলো তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও ফলমূল দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে সহায়তা করবে, পরিবহন ব্যয় কমাবে এবং পাড়ার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর ফলে স্থানীয় পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে ২০২৪ সাল থেকে অদ্যাবধি বাস্তুচ্যুত বম জনগোষ্ঠীর ২১১ পরিবারের সর্বমোট ৫৩১ জন সদস্য নিজ পাড়ায় প্রত্যাবর্তন করেছেন। প্রত্যাবর্তনকারী বম পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বান্দরবান রিজিয়নের নির্দেশনায় ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কেওক্রাডং-সুংসুং পর্যটন এলাকা পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। এছাড়া সেনাবাহিনীর অর্থায়নে সুংসুংপাড়ায় একটি ইকো রিসোর্ট নির্মাণ শেষে পাড়াবাসীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতায় বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা সহজতর করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে সদর দপ্তর বান্দরবান রিজিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাকলাইপাড়া আর্মি ক্যাম্পের আওতাধীন পাড়াবাসীর কাছে দুটি চাঁদের গাড়ি হস্তান্তর করা হয়।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে কাইথনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বান্দরবান রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম স্থানীয় প্রতিনিধিদের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ আতিকুল করিম, বলীপাড়া ৩৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইয়াসির আরাফাত হোসেন, বান্দরবান রিজিয়নের জি-৩ ক্যাপ্টেন সামিউল ইসলাম, থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-ফয়সাল, মেজর আসিফ জুবায়ের, পার্বত্য বম কাউন্সিল সোসাইটির সভাপতি ও জেলা পরিষদের সদস্য লালজার বমসহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান, কারবারি ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বান্দরবান রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেই সমন্বিত লক্ষ্য সামনে রেখে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রসঙ্গত, সেনাবাহিনী জানায়, ২০২০ সালে কুকি-চিন সন্ত্রাসী তৎপরতার সময় ভারতে মিজোরামে আশ্রয় নেওয়ার পর দেশে ফিরে আসা ছয়টি বমপাড়া, একটি ত্রিপুরাপাড়া ও পাঁচটি ম্রোপাড়াসহ মোট ১২টি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও পরিবহন সংকট নিরসনে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরটিভি/এমএইচজে




