দুই দশক আগেও পদ্মা-যমুনা নদী, চলনবিল ও গাজনার বিলসহ শতাধিক নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় সমৃদ্ধ পাবনায় বর্ষাকাল এলেই দেখা যেত দেশি মাছের সমারোহ। গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার সয়লাব থাকত কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুঁটি, মলা, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, চিতল, বাইম, খলিসাসহ নানা প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। তবে সময়ের বির্বতনে, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের প্রভাবে এখন বর্ষার মৌসুমেও জেলার ১৬টি নদী ও শতাধিক বিল-জলাশয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে দেশি মাছ মিলছে না। ফলে বাজারে দেশি মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভোক্তাদের চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ নির্মাণ, খাল-বিল ভরাট, জলাশয় দূষণ, প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া, ডিম ছাড়ার আগেই মা মাছ আহরণ এবং কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি, বেড় জাল ও মশারি জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল সহ অন্যান্য কারণে ৫০টিরও বেশি দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দশক আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় আড়াই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তার উল্লেখযোগ্য অংশ বিরল হয়ে পড়েছে। অপরদিকে সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, কমন কার্প, মিরর কার্প, বিগহেড কার্প, থাই সরপুঁটি, থাই কৈ, থাই পাঙাশ, আফ্রিকান মাগুর ও বিভিন্ন জাতের তেলাপিয়াসহ বিদেশি ও হাইব্রিড প্রজাতির মাছের চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিক লাভের আশায় চাষের মাছের বিস্তারও দেশী মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার অন্যতম কারণ।
চলনবিল বেষ্টিত চাটমোহরের মাছ ব্যাবসায়ী সোলায়মান বলেন, দুই দশক আগেও আমাদের চলনবিলসহ অন্যান্য বিল শতাধিক প্রজাতির দেশীয় মাছে ভরপুর ছিল। চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের কারণে বর্তমানে দেশীয় মাছের সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। যেকারণে বাধ্যতামূলকভাবে ক্রেতাদের চাষ করা হাইব্রিড মাছ কিনে খেতে হচ্ছে।
নগরবাড়ী এলাকার মাছের আড়তদার হাসমত জানান, কয়েকবছর আগেও নদীতে প্রচুর পরিমাণে বোয়াল, পাঙাশ, আইড়, বাঘাইড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল দিয়ে পোনা অবস্থায় অবাধে শিকারের কারণে মাছগুলো তেমন পাওয়া যায় না।
গাজনার বিল এলাকার কয়ে জন বাসিন্দা জানান, একসময় গাজনার বিলে কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুঁটি, মলা, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, চিতল, বাইম, খলিসাসহ প্রায় শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের প্রভাবে এসব মাছ প্রায় অনুপস্থিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী-নালা, খাল-বিল ও প্লাবনভূমি পুনঃখনন, প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ এবং জলাশয় দখল ও দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব আরও সংকটের মুখে পড়বে।
পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল বলেন, বিভিন্ন কারণে পাবনায় দেশীয় মাছের সংকট দেখা দিয়েছে তার মধ্যে কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জাল অন্যতম। এসব জাল উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশীয় মাছ রক্ষায় আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
আরটিভি/এমএইচজে




