ইলেকট্রিক গাড়ির নীতিমালা নিয়ে সরকারের বড় উদ্যোগ

বাসস

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ , ০২:৩৯ পিএম


ইলেকট্রিক গাড়ির নীতিমালা নিয়ে সরকারের বড় উদ্যোগ
ইলেকট্রিক গাড়ির পুরনো ছবি

দেশে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়ন করছে সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয় এ কাজ করছে।

নীতিমালায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ একটি সমন্বিত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) শিল্পকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক খাতে রূপান্তরের রূপরেখাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

এজন্য ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও তার যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন কাজে ব্যবহারের জন্য শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর ১ শতাংশ হারে সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি) আরোপ এবং আমদানি, স্থানীয় ক্রয় ও সরবরাহ পর্যায়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ইলেকট্রিক ভেহিকেলে ব্যবহৃত লেড ব্যাটারি ও লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে কর অব্যাহতি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে খসড়া প্রণয়নের কাজ শেষ করা হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের নীতি, আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব সুলতানা ইয়াসমীন জানান, চলতি বছরেই এ নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। আগামী দিনে দেশে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ব্যবহার বাড়বে। এ অবস্থায় দেশেই যেন ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও যন্ত্রাংশ তৈরি করা যায়, সে লক্ষ্যেই এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামতের জন্য এটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। 

নীতিমালায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানো অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে পরিবহন খাত বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম প্রধান উৎস। এ প্রেক্ষাপটে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

নীতিমালার ভিশন অনুযায়ী, দেশে ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্পকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই শিল্পে পরিণত করা হবে। আর মিশন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্ভাবনা সৃষ্টি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নীতিমালায় আরও বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বড় হুমকি। পরিবহন খাত থেকে ব্যাপক কার্বন নিঃসরণ এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ কারণে ইলেকট্রিক ভেহিকেল ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

নীতিমালার লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে: স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের ব্যবহার কমানো। 

পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসও অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ইভি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নীতিমালায় বিভিন্ন কর সুবিধা ও প্রণোদনা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইভি নিবন্ধন ফি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস; ২০৩০ সাল পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) অব্যাহতি; আমদানিতে কম শুল্কহার; ২০৪০ সাল পর্যন্ত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আয়কর ছাড় এবং ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক সুবিধা।

এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

আরও পড়ুন

এতে দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ইলেকট্রিক ভেহিকেল ব্যবহারে সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তুলতে সারাদেশে চার্জিং স্টেশন স্থাপনেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়া হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে চার্জিং সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। নতুন ভবন নির্মাণেও ইভি চার্জিং সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নীতিমালায় ইভির নিরাপত্তা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস ও মান নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হবে। এ ছাড়া দেশের বিপুলসংখ্যক তিন চাকাবিশিষ্ট ইলেকট্রিক ভেহিকেলকে (যা ইজি বাইক নামে পরিচিত) বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত মান ও টেস্টিং সম্পন্ন করে নিবন্ধন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ডিলার, এজেন্ট, আমদানিকারক, স্থানীয় প্রস্তুতকারক এবং উৎপাদনকারীরা কোনোক্রমেই নিবন্ধন ছাড়া ইলেকট্রিক থ্রিহুইলার ও মোটরসাইকেল ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না। 

সরকারি ব্যবহারে ইভির বাধ্যবাধকতা: নীতিমালায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের যানবাহন ক্রয়ের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ ইলেকট্রিক ভেহিকেল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন কাউন্সিল’ গঠন করা হবে। এই কাউন্সিল নীতিমালা বাস্তবায়ন, সমন্বয়, তদারকি ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। 

এ ছাড়া বাস্তবায়ন কমিটি ও কারিগরি কমিটিও গঠন করা হবে। নীতিমালায় গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কারিগরি শিক্ষায় ইভি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে একটি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দেশে পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি সাশ্রয়, শিল্পায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।

পাশাপাশি বৈশ্বিক ইলেকট্রিক ভেহিকেল বাজারেও বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।

আরটিভি/আইএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission