রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় নতুন করে সহায়তা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয় প্রবাহ উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রেখেছে এবং অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ২৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ৩০.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে এসেছে ২৬.২১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২১.৭৯ বিলিয়ন ডলার।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৪২৬ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে অর্জিত ২৩ হাজার ৬৬৬ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রবৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা, হুন্ডি বা অবৈধ পথে টাকা পাঠানো বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং বিশ্ব শ্রমবাজারের ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রপ্তানির পাশাপাশি রেমিট্যান্স এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই প্রবাহ চলতি হিসাবের ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করতে ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসারও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা এখনো রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস। এর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মালয়েশিয়া শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা লেনদেন খরচ কমানো এবং গ্রামাঞ্চলে মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার বাড়ানোরও আহ্বান জানান।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও লেনদেনের ভারসাম্যের মতো নির্দেশকগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তিনি এই স্থিতিশীলতার কৃতিত্ব নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থাকে দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং ডলার সংকটের সময় ব্যাংকগুলোর এলসি খোলার যে সমস্যাগুলো ছিল, তা এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তিনি সরকারকে দ্রুত বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ঝুঁকি তৈরি করছে, কারণ ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা শ্রমের চাহিদা ও কর্মী যাতায়াতকে ব্যাহত করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রয়েছে, তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স ইতিবাচক প্রবণতা দেখাচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল করতে সহায়তা করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা এখন অবৈধ ‘হুন্ডি’ ব্যবস্থার পরিবর্তে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছেন, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক।
১৬ এপ্রিল প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৫.০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে আইএমএফ’র বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩০.৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হুন্ডি অপারেটরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ফলে অবৈধ চ্যানেলের চাহিদা কমেছে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছে।
তিনি বলেন, রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে দৃশ্যমান, যেখানে অনেক পরিবার প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে রেমিট্যান্স ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বস্তি দিয়েছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, রেমিট্যান্স আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়, কারণ এটি গ্রাহকদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করে। তবে তিনি লেনদেন খরচ আরও কমানো এবং রিয়েল-টাইম ফান্ড ট্রান্সফার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন যাতে বৈধ চ্যানেলগুলো আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়।
তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্স সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে তারল্য বাড়িয়ে দেশীয় বিনিয়োগকে সহায়তা করে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে রেমিট্যান্স প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা পোর্টফোলিও বিনিয়োগের তুলনায় বেশি স্থিতিশীল।
তিনি বলেন, রেমিট্যান্স শুধু অর্থনৈতিক প্রবাহ নয়, এটি বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রাণশক্তি।
তিনি আরও বলেন, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করে, লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নত করে এবং টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নীতিগত উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে আরও সংযুক্তি প্রয়োজন।
আরটিভি/এসএস




