ব্যাংকিং খাতের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া নতুন এক সিদ্ধান্তের কারণে চরম চাপে পড়েছে দেশের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার নিচে থাকা ব্যাংকগুলো শেয়ারহোল্ডারদের কোনো নগদ লভ্যাংশ (ক্যাশ ডিভিডেন্ড) দিতে পারবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর শর্তের কারণে আগামী বছর থেকে দেশের তালিকাভুক্ত প্রায় সব ব্যাংকই নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার যোগ্যতা হারাচ্ছে, যা সামগ্রিক পুঁজিবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শনিবার (২৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের সাস্টেইনেবিলিটি অ্যান্ড সুপারভিশন পলিসি ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা এক পরিপত্রের মাধ্যমে এই নতুন নীতিমালার কথা জানানো হয়। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের বার্ষিক হিসাব ও তার পরবর্তী লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল ব্র্যাক ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি-এর পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার ওপরে রয়েছে। তবে ন্যাশনাল ব্যাংক ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে থাকায় আইন অনুযায়ী তারা কোনো লভ্যাংশ দিতে পারবে না। ফলে দেশের এতগুলো তালিকাভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে একমাত্র ব্র্যাক ব্যাংকই আগামী বছর নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ পাবে। এ ছাড়া ২ হাজার কোটি টাকার শর্ত পূরণ করা ব্যাংকের ক্ষেত্রেও নগদ লভ্যাংশের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি অংশ বোনাস শেয়ার হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই আকস্মিক পদক্ষেপে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ভালো ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে বাজারে এর বড় ধাক্কা লাগবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি আসিফ খান এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, বর্তমানে মাত্র একটি ব্যাংক কার্যকরভাবে এই শর্ত পূরণ করতে পারছে। ফলে বেশির ভাগ সবল ব্যাংকও আগামী বছর থেকে নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না, যা নিশ্চিতভাবেই পুঁজিবাজারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
আসিফ খান আরও বলেন, অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কোনো প্রভিশন ঘাটতি নেই, তারপরও কেবল পরিশোধিত মূলধন কম হওয়ার কারণে তাদের নগদ লভ্যাংশ দেওয়া থেকে বিরত রাখা অযৌক্তিক। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়মের সঙ্গেও এর নীতিগত সংঘাত তৈরি হবে, কারণ লভ্যাংশ না দিলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ওপর বাড়তি কর আরোপের নিয়ম রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘এই নিয়মের কারণে এখন সুস্থ ও ভালো ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডাররা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিনিয়োগের জন্য মানুষকে পুঁজিবাজারে যেতে উৎসাহিত করার যে সরকারি এজেন্ডা রয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তাতে মোটেও সাহায্য করবে না।’ তিনি পরিশোধিত মূলধনের পরিবর্তে ‘মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত’ বা সিএআর বিবেচনা করার দাবি জানান।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, সিটি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৭৪৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ৬৪৩ কোটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ১ হাজার ৬০৯ কোটি এবং ইউসিবির ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া পূবালী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকসহ অন্য সব শীর্ষ ব্যাংকই এই ২ হাজার কোটি টাকার সীমার নিচে রয়েছে। এখন নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার যোগ্যতা ফিরে পেতে ব্যাংকগুলোকে দ্রুত রাইট শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর চাপ সামলাতে হবে।
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে এটি ব্যাংকগুলোর আর্থিক নমনীয়তা যেমন কমাবে, তেমনি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ফাটল ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরটিভি/এআর



