নতুন পে-স্কেলে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

আরটিভি নিউজ

রোববার, ৩১ মে ২০২৬ , ০৮:৪১ পিএম


নতুন পে-স্কেলে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন
ছবি : প্রতীকী

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম দুই বছরে মূল বেতনে ৫০ শতাংশ করে সমন্বয় এবং তৃতীয় বছরে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত করার প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এজন্য আসন্ন বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হবে।  

তবে বেতন কত শতাংশ বাড়বে এবং পুরো পে-স্কেল একবারে কার্যকর হবে নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী বাজেটেই নতুন বেতন কাঠামো নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়ন হবে। তবে বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে এখনও কথাবার্তা চলছে। নবম পে-স্কেল পুরোপুরি কার্যকর হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বাজেটেই শুরু হবে।’

আরও পড়ুন

তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নবম পে-স্কেল আগামী তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ কৌশল নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের একটি বড় অংশ কার্যকর করা হবে। এজন্য বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে অতিরিক্ত ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করতে যাচ্ছে অর্থ বিভাগ।

নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন একবারে না বাড়িয়ে তিন অর্থবছরে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় অর্থবছরে ৫০% করে মূল বেতন বৃদ্ধি পাবে এবং তৃতীয় অর্থবছরে নতুন বেতনকাঠামোর বাকি অংশ ও ভাতা কার্যকর করা হবে।

পে-স্কেল বাস্তবায়নের ধাপগুলো হলো

প্রথম ধাপ (প্রথম বছর): প্রস্তাবিত পে-স্কেলের বর্ধিত মূল বেতনের (Basic Pay) প্রথম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
দ্বিতীয় ধাপ (দ্বিতীয় বছর): পরবর্তী অর্থবছরে মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ যুক্ত হবে।
তৃতীয় ধাপ (তৃতীয় বছর): তৃতীয় অর্থবছরে সার্বিক বেতনকাঠামোর চূড়ান্ত সমন্বয় ও অন্যান্য ভাতা (যেমন—বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ইত্যাদি) বাস্তবায়ন করা হবে। 
১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব

জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫-এর সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোতে—
সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।
সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানের মতো ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে।
সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা বর্তমানে ১:৯.৪।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পুরো সুপারিশ একযোগে বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

আরও পড়ুন

গ্রেডভিত্তিক পরিবর্তনের মূল চিত্র:
১ম গ্রেড: নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, ১ম গ্রেডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মূল বেতন বর্তমানের ৭৮,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে সরাসরি ১,১৭,০০0 টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে।
১০ম গ্রেড: মধ্যম স্তরের অর্থাৎ ১০ম গ্রেডের মূল বেতন ১৬,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৪,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

২০তম গ্রেড: সর্বনিম্ন স্তরের অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১২,৩৭৫ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো (১ম থেকে ২০তম গ্রেড)
গ্রেড    বর্তমান মূল বেতন (টাকা)    ৫০% বৃদ্ধিতে প্রস্তাবিত নতুন বেতন (টাকা)
১ম                          ৭৮,০০০                                   ১,১৭,০০০
২য়                          ৬৬,০০০                                  ৯৯,০০০
৩য়                          ৫৬,৫০০                                  ৮৪,৭৫০
৪র্থ                          ৫০,০০০                                   ৭৫,০০০
৫ম                          ৪৩,০০০                                  ৬৪,৫০০
৬ষ্ঠ                          ৩৫,৫০০                                 ৫৩,২৫০
৭ম                          ২৯,০০০                                   ৪৩,৫০০
৮ম                          ২৩,০০০                                  ৩৪,৫০০
৯ম                          ২২,০০০                                   ৩৩,০০০
১০ম                         ১৬,০০০                                  ২৪,০০০
১১তম                       ১২,০০০                                 ১৮,৭৫০
১২তম                       ১১,৩০০                                 ১৬,৯৫০
১৩তম                      ১১,০০০                                  ১৬,৫০০
১৪তম                       ১০,২০০                                 ১৫,৩০০
১৫তম                      ৯,৭০০                                   ১৪,৫৫০
১৬তম                      ৯,৩০০                                  ১৩,৯৫০
১৭তম                       ৯,০০০                                  ১৩,৫০০
১৮তম                      ৮,৮০০                                  ১৩,২০০
১৯তম                      ৮,৫০০                                  ১২,৭৫০
২০তম                      ৮,২৫০                                  ১২,৩৭৫

* ১১তম গ্রেডের বর্তমান বেতনের সংখ্যা অসম্পূর্ণ ছিল, তাই সম্ভাব্য মান হিসেবে ধরা হয়েছে।

কেন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন?
অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ড. এ কে এনামুল হক মনে করেন, একসঙ্গে পুরো পে-স্কেল কার্যকর করা হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, বাজারে মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে কমিশন তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদও মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বড় বাজেট ঘাটতির বাস্তবতায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

আরও পড়ুন

পেনশন ও ভাতাতেও বড় পরিবর্তনের সুপারিশ
নতুন বেতন কাঠামোর পাশাপাশি পেনশন ও বিভিন্ন ভাতায়ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সুপারিশ অনুযায়ী—
মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হতে পারে ৭৫ শতাংশ। ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ।

এ ছাড়া ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে এমন সরকারি কর্মচারীদের জন্য মাসিক ২ হাজার টাকা বিশেষ ভাতার সুপারিশও করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী এই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরাসরি প্রায় ২৪ লাখ মানুষ এর সুফল পাবেন।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission