ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

বাসস

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং- ছবি: বাসস

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের প্রত্যাশা নিয়ে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকে ঘিরে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ইতোমধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদন খাতে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে চীনা অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোকে গতি দিয়েছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রধান আমদানিকারক দেশও। যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, শিল্প কাঁচামাল ও টেক্সটাইল ইনপুটের বড় অংশই দেশটি থেকে আসে।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল (রোববার) দু'দিনের সফরে মালয়েশিয়া গেছেন। এটি তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। মালয়েশিয়া সফর শেষে আজ (সোমবার) রাতে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম গত শনিবার গণমাধ্যমকে জানান, সফরে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে।

আসাদ আলম আরও জানান, সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা ও প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সফরের শুরুতে দালিয়ানে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নেবেন। সেখানে তিনি 'ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ' শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। এরপর তিনি ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পরে বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, এক্সিম ব্যাংকসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন।

আগামী ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কতৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম'-এ তিনি প্রধান বক্তা হিসেবে দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে এই বাণিজ্যের কাঠামো মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি অংশ তুলনামূলকভাবে কম।

তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে চীন বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ ( জিডিআই) কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও জিডিআই এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিভিত্তিক কাঠামো নয়, বরং একটি বহুপাক্ষিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, এই উদ্যোগগুলোর আওতায় প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, চীনের বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদন শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস, হালকা প্রকৌশল ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় উভয়ই বাড়বে।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম বাসসকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

তাঁর মতে, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৃষিখাতে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ দেখালেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিনিয়োগ আসেনি।

মোহা. খোরশেদ আলম আরও বলেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বাংলাদেশে কাজে লাগানো গেলে পুঁজিবাজার আরও গভীর ও স্থিতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিল্প সহযোগিতা বাড়লে উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ টানতে হলে সুস্পষ্ট নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। চীনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, এতে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং লেনদেন ব্যয় হ্রাস পাবে।

চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি সিসিইসিসির দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ইউসেফ শু বাসসকে বলেন, চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। তার মতে, এই উচ্চপর্যায়ের সফর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কতৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম'-এ চীনা ব্যবসায়ীরা অংশ নেবেন এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেবেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, আগামী দিনে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতি নির্ভর করবে তিনটি মূল বিষয়ের ওপরÑবিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর। এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

আরটিভি/এমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
জাপানে রপ্তানি বাড়াতে আগ্রহী তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা
নির্দিষ্ট কিছু বাজারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে তৈরি পোশাক খাতকে ঝুঁকিমুক্ত করতে নতুন বাজার হিসেবে জাপানে রপ্তানি বাড়াতে চান বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা।
জাপানে রপ্তানি বাড়াতে আগ্রহী তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা
বিদ্যুতায়ন বাড়িয়ে জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কমাতে পারে বাংলাদেশ: আইইএ
পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে বাংলাদেশ। এতে খরচ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব।
বিদ্যুতায়ন বাড়িয়ে জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কমাতে পারে বাংলাদেশ: আইইএ
বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৬ষ্ঠ বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত
বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৬ষ্ঠ বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৬ষ্ঠ বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত
বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় পতন
মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) কর্মকর্তাদের কঠোর আর্থিক নীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে বড় পতন ঘটেছে।
বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় পতন
টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে টাকার মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তিতে নতুন একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় বিদেশি ট্রেডিং পার্টনার ব্যাংকের নামে কোনো প্রারম্ভিক জমা ছাড়াই ‘টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট’ খোলা ও পরিচালনা করা যাবে।
টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের
আরও পড়ুন
মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশ বৈঠক
রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী
দুবাইয়ের শাসকের ভাইয়ের মৃত্যুতে তারেক রহমানের শোক
নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী