বাড়ছে শিং মাছ চাষে জনপ্রিয়তা

আরটিভি নিউজ  

রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬ , ০৪:৫২ পিএম


বাড়ছে শিং মাছ চাষে জনপ্রিয়তা
শিং মাছ। ছবি: সংগৃহীত

দেশে শিং মাছ চাষ জনপ্রিয় ও লাভজনক হয়ে উঠছে। খেতে সুস্বাদু ও সহজপাচ্য উচ্চমানের প্রচুর আমিষ থাকায় এ মাছের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে। শিং মাছ চাষের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি স্বল্প জায়গায় এবং অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায়। ফলে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক এ মাছ চাষে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের।

চাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে দেশি শিং মাছ চাষ করে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। আর মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত মৎস্য চাষিরা আধা নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে, সেক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি মুনাফা পেয়ে থাকেন।

দেশে শিং মাছের পোনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধলা এলাকা। সেখান থেকে মাছের পোনা ক্রয় করে নির্ধারিত পুকুর বা জলাশয়ে চাষ করছেন চাষিরা। এছাড়া কুমিল্লা, যশোর, নরসিংদী, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলে বর্তমানে শিং মাছ চাষ হচ্ছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলা গ্রামের মাছ চাষিরা দেশি শিং মাছ চাষ করে আর্থিকভাবে সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। এক শতাংশের ছোট একটি পুকুরে শিং মাছ চাষ করে প্রতি ৬ মাস অন্তর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা। 

মাছ চাষকে কেন্দ্র করে ধলায় গড়ে উঠেছে ৩৫টি মৎস্য হ্যাচারি। অন্তত ৫০০ পরিবার মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার লোকের। এছাড়া মাছ চাষ করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন ৬ জন মৎস্য চাষি।

আরও পড়ুন

আজিম উদ্দিন ধলা গ্রামের একজন মাছ চাষি। তিনি মাছ চাষ করে পরিবারে ফিরিয়ে এনেছেন সচ্ছলতা, পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখন তার ৩০টি পুকুরে মাছ চাষ হয়। 

তিনি জানান, এক শতক জায়গায় কার্প জাতীয় মাছ ৫০ থেকে ৬০টি চাষ করা যায়। অথচ অল্প জায়গায় শিং মাছ চাষ করে অনেক বেশি লাভবান হওয়া যায়।

মাছ চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত ধলার যুবক অজিৎ বর্মণ জানান, লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছের পোনা সরবরাহ করেন। সারা দেশে অনেক জলাশয় খালি পড়ে থাকে। এসব জলাশয়ে অন্তত ৬ মাস শিং মাছ চাষ করলেও অনেক বেকার যুবক আর্থিকভাবে লাভবান হবে।

দুই জন মাছ চাষি জানান, বর্তমান বাজারে ১ দশমিক ৫ বা ২ ইঞ্চির প্রতিটি শিং মাছের দাম ৩ টাকা। সে হিসাবে ৫০ হাজার শিং মাছের পোনার দাম ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সঠিকভাবে খাবার ও যত্ন নিলে ৫ থেকে ৬ মাস পরে প্রতিটি শিং মাছের ওজন হয় ৪০ বা ৫০ গ্রাম অর্থাৎ ৬ মাস পর ২০ থেকে ২৫টি শিং মাছের ওজন হয় ১ কেজি। 

ধলার মাছ চাষিদের তথ্যানুযায়ী, কোনো জলাশয়ে ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করলে কমপক্ষে ৪৮ হাজার শিং মাছ টিকে থাকে। ৬ মাস পর ৪৮ হাজার শিং মাছের ওজন হয় ১ হজার ৯২০ কেজি। বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি শিং মাছের পাইকারি বিক্রয় মূল্য ৫০০ টাকা। এ হিসাবে ১ হজার ৯২০ কেজি  মাছের বিক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

এদিকে ৪৮ হাজার মাছের জন্য ৬ মাসে সর্বোচ্চ ৪ টন খাবার প্রয়োজন হয়। প্রতি টন মাছের খাবারে খুচরা মূল্য ৫০ হাজার টাকা হলে ৪ টন খাবার এর দাম পড়ে ২ লাখ টাকা। কোনো জলাশয়ে ৬ মাস ৪৮ হাজার শিং মাছ চাষ করলে শ্রমিক ও পরিবহন খরচবাবদ ব্যয় হতে পারে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সব খরচ বাদে ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করে প্রতি ৬ মাসে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। 

সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, এক শতাংশ জায়গায় ১ হাজার শিং মাছ চাষ করা যায়। ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করার জন্য ৫০ শতাংশের একটি পুকুর বা জলাশয় প্রয়োজন হবে, যা থেকে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় সম্ভব।

কই, শিং, এবং ঢেলাসহ দেশীয় ও হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ছোট মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর সাবেক পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এইচ এম কোহিনুর। 

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মৎস্য বিজ্ঞানী শিং মাছ চাষের সম্ভাবনা ও পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা- বাসসের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, শিং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ। এ মাছে ফ্যাট বা তেলের পরিমাণ কম এবং সহজপাচ্য উচ্চমানের প্রচুর আমিষ থাকায় সবার মধ্যে বিশেষ করে রোগীদের মধ্যে এ মাছের প্রচুর চাহিদা ও কদর রয়েছে। 

তিনি বলেন, জিয়ল মাছের চাহিদা অন্য সব মাছের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি। সাধারণত মৎস্য চাষিরা আধা নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে থাকেন। এ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষে বেশি লাভ হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের অনেক চাষি বিএফআরআই’র কারিগরি সহযোগিতায় শিং মাছের নিবিড় চাষ করে অধিক লাভবান হয়েছেন।

ড. এ এইচ এম কোহিনুর জানান, শিং মাছের নিবিড় চাষের জন্য ২০ থেকে ৬০ শতাংশ আয়তনের ছায়াযুক্ত পুকুর নির্বাচন করা যেতে পারে, যেখানে বছরে কমপক্ষে ৭-৮ মাস ১ থেকে ১.৫ মিটার পানি থাকতে হবে। শিং মাছ নিবিড় চাষের জন্য প্রথমত পুকুর ভালোমতো শুকাতে হবে। পুকুরের তলদেশের পচা কাদা অপসারণ করে ৭ দিন রৌদ্রে শুকাতে হবে। তলা থেকে ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস করার জন্য প্রতি শতাংশে ১৫ থেকে ২০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার ভালোভাবে ছিটিয়ে দিয়ে ৩ থেকে ৫ দিন পরে পুকুর বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ১ মিটার পরিমাণ পূর্ণ করতে হবে। 

পানি পূর্ণ করার পর শতাংশ প্রতি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ কেজি কলিচুন পানিতে মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করে পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। চুন প্রয়োগের ৩ দিন পরে পোনা মজুদের ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিং মাছের পোনা পরিবহনকালে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে- সেক্ষেত্রে পোনা পরিবহনের সময় প্লাস্টিক ড্রাম ব্যবহার করাই উত্তম বলে তিনি জানান। 

তিনি বলেন, দূরত্ব অনুযায়ী প্রতি ড্রামে ৭ থেকে ৯ সেন্টিমিটার আকারের ২ থেকে ৩ কেজি পোনা অথবা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার পোনা পরিবহন করা যায়। এভাবে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় দূরত্বে নির্বিঘ্নে পোনা পরিবহন করা যেতে পারে।

শিং মাছের নিবিড় চাষ ব্যবস্থাপনায় প্রতি শতাংশে ৬ হাজার সুস্থ্য-সবল ও গুণগত মানসম্পন্ন পোনা প্রস্তুতকৃত পুকুরে মজুদ করা যেতে পারে। পোনা পুকুরে মজুদের সময় অবশ্যই পোনা ভর্তি পাত্রের পানির তাপমাত্রা ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা সমতায় এনে ভালোভাবে অভ্যস্থকরণ বা কন্ডিশনিং করতে হবে। পোনা মজুদের পরের দিন থেকে প্রাণিজ প্রোটিন (৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ) সমৃদ্ধ সম্পূরক খাদ্য মাছের দেহ ওজনের শতকরা ১৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রয়োগ করা যেতে পারে। সম্পূরক খাদ্য দুই ভাগ করে সন্ধ্যায় ও সূর্য উদিত হওয়ার আগে প্রয়োগ করতে হয়।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক বলেন, শিং মাছ চাষের জন্য নিয়মিতভাবে পুকুরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পানির গভীরতা ৪ থেকে ৫ ফুটের মধ্যে অবশ্যই রাখতে হবে। প্রতি  ১৫ দিন পরপর শিং মাছের নমুনায়ন করে সম্পূরক খাদ্যের পরিমাণ নির্ধারণ এবং পোনা মজুদের এক মাস পর হতে প্রতি ১৫ দিন অন্তর শতাংশ প্রতি ১০০ গ্রাম চুন ও পরবর্তী ১৫ দিন পর ৪০০ গ্রাম লবণ প্রয়োগ করতে হবে। সপ্তাহে কমপক্ষে ৩ দিন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। 

তিনি বলেন, সাধারণত পোনা মজুদের সাত মাস পর মাছ আহরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সময়ে মাছের গড় ওজন ৫৫ থেকে ৬৫ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। এ পদ্ধতি অনুসরণে ৫০ শতাংশ পুকুর থেকে ৭ মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার কেজি শিং উৎপাদন করা যায়। এ পদ্ধতিতে ৭ থেকে ৮ মাসে শিং মাছের নিবিড় চাষে ৫০ শতাংশ পুকুরে চার লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় করে এক ফসলে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission