প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পেরোলেও আবাসন সংকটে জর্জরিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাবি সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ 

রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬ , ০১:২৮ পিএম


প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পেরোলেও আবাসন সংকটে জর্জরিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি

ঐতিহ্য, শিক্ষা ও গবেষণায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ হিসেবে সাত দশকেরও বেশি সময় পার করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। তবে প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পার করলেও দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটে জর্জরিত বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী।

ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে উচ্চ ভাড়ার মেস কিংবা অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও নানামুখী দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণ ও আসনসংখ্যা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসলেও কার্যকর সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়। 

১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই সাতটি বিভাগে ১৫৬ জন ছাত্র ও পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে দেশের শীর্ষ এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে ১২টি অনুষদে ৫৯টি বিভাগ ও ৬টি ইনস্টিটিউটে রয়েছে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনায় সূতিকাগার হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সবশেষ চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এক জ্বলন্ত বারুদ। দেশের মাটি ও মানুষের সব ধরনের ক্রান্তিলগ্নে সামনের সারিতে থেকে পথের দিশা, আলোর ঝলকানি দেখিয়েছে দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠ। দীর্ঘ এই সাত দশকের গৌরবময় পথচলায় এ বিদ্যাপীঠে আজও নিশ্চিত করা যায়নি শতভাগ আবাসন সুবিধা। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ হাজারের অধিক নিয়মিত শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর বিপরীতে, ছেলেদের এগারোটি ও মেয়েদের ছয়টি আবাসিক হলে যথাক্রমে ৫ হাজার ৪৬৯ জন ও ৪ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। মোট ৯ হাজার ৬৭৩ জন শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছে।  

দীর্ঘদিনের এ আবাসন সংকট নিরসনে ছাত্রদের জন্য ১০ তলাবিশিষ্ট বিজয়-৭১ হল (সাবেক শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হল) এবং ছাত্রীদের জন্য অপরাজিতা হলের (সাবেক শেখ হাসিনা হল) নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। হল দুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে আরও প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। তবে সেই নির্মাণকাজও চলছে ধীর গতিতে। নির্মাণ কাজে একাধিকবার সময় বাড়ানো হলেও ৫ বছরেরও পুরোপুরি কাজ শেষ করতে পারেনি।  

এদিকে, গত বছর নভেম্বরে ভূমিকম্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে-বাংলা ফজলুল হক হলের ছাদ ও দেওয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায় ওই হলের শিক্ষার্থীদের নির্মাণাধীন বিজয়-৭১ হলে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই এ হলের দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মন্নুজান হলে কয়েক হাজার নারী শিক্ষার্থী ঝুঁকির মধ্যেই অবস্থান করছেন।

দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অনাবাসিক শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন আরটিভিকে বলেন, মাত্র ৩৩% শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে বড় একটি বাধা। আবাসন সংকটের কারণে আমরা হাজারো শিক্ষার্থী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে যে মেস গুলো রয়েছে এগুলো নিরাপদ না শিক্ষার্থীদের জন্য। বাহিরের মেসগুলোতে প্রতিনিয়তই মোবাইল, ল্যাপটপ চুরির ঘটনা ঘটছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আবাসিক সংকট নিরসন এখন সময়ের দাবি। 

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অনাবাসিক শিক্ষার্থী তালহা তামিম বলেন, আমাদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা শুধু একটি সুবিধা নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষা ও সুস্থ শিক্ষার পরিবেশের একটি পূর্বশর্ত। আবাসন ব্যয়, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ এবং আয়ের সীমিত সুযোগ আমাদের দুর্ভোগকে প্রচণ্ড রকম বাড়িয়ে তুলে। তাই প্রশাসনের কাছে আমাদের জোরালো দাবি যে, দ্রুত নতুন আবাসিক হল নির্মাণ, বিদ্যমান হলগুলোর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে হল বরাদ্দে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বজায় রেখে আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা।

রাকসুর এজিএস এস এম সালমান সাব্বির বলেন, আবাসন সংকট নিরসনের জন্য প্রশাসনের কাছে পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ চাওয়া হয়েছে এবং নকীব স্যারের আমলেই ৬-৭টা হলের জন্য ফাইল ইউজিসিতে প্রশাসনের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, বাজেট দ্রুতই পাশ হবে। যদি বাজেট পাশ করিয়ে আনা যায় বা বাজেট পাশ হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট অনেকটা কমবে। 

আবাসন সংকট নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকুক, আবাসিকতা লাভ করুক। ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আমাদের হলে থাকার সুযোগ পায় আর বাকিরা হলের বাহিরে থাকে। এই বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীকে আবাসিকতা দেওয়া অল্প কিছু দিনের মধ্যে সম্ভব না, এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আমরা সেটাই দেখছি এবং এমন একটা ভূমিকা রাখতে যাচ্ছি যেন সর্বোচ্চ পরিমাণ শিক্ষার্থীকে যেন আবাসিকতা দেওয়া যায়। 

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে প্রজেক্টগুলো চলমান রয়েছে এগুলো বাস্তবায়ন করা পাশাপাশি কিছু নতুন কিছু প্রজেক্টও নিয়ে আসতে চাই। আমার তিনটা উদ্যোগ রয়েছে, তার মধ্যে শতভাগ আবাসিকতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।

আরও পড়ুন

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান ধরে রাখতে হলে আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর বাড়তে থাকা শিক্ষার্থীর চাপের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission