বসন্তের মেঘাচ্ছন্ন সকাল। বন শহর। আকস্মিকভাবে সংবাদটি পেয়ে মুষড়ে পড়েছিলাম। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘সুজন সখী' দেখে যাকে চিনেছিলাম সেই চিত্রনায়ক ফারুক আর নেই! বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি ছিলেন মিয়াভাই, যিনি যে কারো প্রয়োজনে আগে বাড়তেন। সঙ্গত কারণেই ফেসবুকের পাতা মিডিয়ার লোকজনের শোকবার্তায় ছেয়ে গেছে। সেই ছায়া ছেয়ে ফেলেছে গোটা রাজনৈতিক অঙ্গনকেও।
ফারুক কেবল একজন বর্ষীয়ান অভিনেতাই ছিলেন না, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সংসদ সদস্যও ছিলেন তিনি। তবে চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন তার সব রকমের পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে। আসল নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু।
পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে দুলুকে নিয়ে সংবাদগুলো পড়ছিলাম। ববিতার স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি চোখে পড়লো, শুনেছি ব্যক্তিজীবনে তিনি অনেক সাহসী ও রাগী ছিলেন। শিল্পী জীবনে তিনি ছিলেন মাটির মানুষ। ক্যামেরার সামনে সত্যিই মাটির মানুষ হয়ে যেতেন। কীভাবে সংলাপ দিতে হবে, কীভাবে দৃশ্যটি আরো সুন্দর হবে- বিষয়গুলো নিয়ে তিনি ভাবতেন। অমন রাগ আর সাহস না থাকলে কেউ কি আর মাতৃভূমির মুক্তির জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
ফারুক ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত জলছবি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে আসেন। জলছবিতে তার নায়িকা ছিলেন কবরী। এরপর তিনি কবরী, সূচন্দা, ববিতা এবং রোজিনাসহ অনেকের সাথে বিভিন্ন সময় জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সাদা-কালো পর্দা থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে অভিনয়, প্রযোজনা ও পরিচালনায় ছিলেন। অভিনয় করেছেন ৬০টির বেশি চলচ্চিত্রে। তার মাঝে লাঠিয়াল, সুজন সখী, নয়নমনি, সারেং বৌ, গোলাপী এখন ট্রেনে, সাহেব, আলোর মিছিল, দিন যায় কথা থাকে এবং মিয়া ভাই উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৫ সালে লাঠিয়াল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
ফারুক সহকর্মীদের কাছেও ছিলেন আপনজন। তাঁর প্রথম ছবির সহশিল্পী খান আতাউর রহমান, কবরী, রোজী আফসারী, আনোয়ার হোসেন বেঁচে থাকলে হয়তো ফারুকের রূপালি পর্দার যৌবনকাল জানা যেতো। বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে চিত্রনায়ক ফারুক সম্পর্কে চলচ্চিত্র অভিনেতা এবং পরিচালক মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) বলেছিলেন... আমি যতটুকু দেখেছি এবং জনসাধারণের পালস যতটুকু বুঝি, সেটা হচ্ছে, গ্রামীণ এবং প্রতিবাদী চরিত্র যদি হতো এবং সেটা যদি ন্যায়ের পক্ষের হয়, তাহলে সেই চরিত্রে ফারুক অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং তুলনাহীন শিল্পী ছিল।
২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে ফারুক নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, একসময় পাড়া-মহল্লায় নাটক বা কোনো অনুষ্ঠান পণ্ড করাই ছিল তার কাজ। ২০ টাকার বিনিময়ে ডিম ছুঁড়ে ভণ্ডুল করে দিতেন সেসব আয়োজন। যুদ্ধজাহাজ চালানোর স্বপ্ন দেখতেন ছোটবেলায়, কিন্তু হয়ে গেলেন অভিনেতা।
তার একসময়ের সহশিল্পী চিত্রনায়িকা অঞ্জনা রহমান লিখেছেন, ফারুক ভাই জীবদ্দশায় সব সময় বলতেন এত চলচ্চিত্রে জীবনে অভিনয় করেছি কিন্তু ফুলেশ্বরী আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র যার গান সব সময় আমি গুনগুন করে গাই৷ নদীরে কত রঙ্গ দেখালি আমায় এই কথাগুলি কখনোই ভুলে যাবার নয়৷ ফারুক ভাই আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার অনবদ্য শ্রেষ্ঠ কর্মের মাধ্যমে, বাংলা চলচ্চিত্রের স্বপ্নিল আকাশে কোটি দর্শকের হৃদয়ে।
ফারুকের মৃত্যুতে মিডিয়া ও রাজনীতি অঙ্গনের মানুষদের শোক প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে সুবর্ণা মোস্তফা, মিশা সওদাগর, পূর্ণিমা, মনোয়ার হোসেন ডিপজল, অনন্ত জলিল, নায়ক নিরব, বিবি রাসেল, প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম খসরু, রবি চৌধুরী, জাহান মুন্নী অন্যতম।
চিত্রনায়ক ফারুকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ অনেকে। মিয়াভাই-এর মৃত্যু যেন চলচ্চিত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে একবিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছে। স্কুল জীবন থেকে মিয়াভাই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন।
১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রায় ৩৭টি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণে জর্জরিত হয়েও সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ছিলেন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে। হন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি।
কোভিড মহামারি আসার পর থেকেই এই বর্ষীয়ান অভিনেতার দুঃসময়ের শুরু। ২০২০ সালে জ্বরে ভুগে দুই দফা ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিয়ে যেতে হয় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে।
প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা পেলেও এক সময় জানা যায়, দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসার জন্য বিক্রি করতে হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা দামের দুটি ফ্ল্যাট, যে দুটি ফ্ল্যাট কেনা হয়েছিল তাদের পারিবারিক ব্যবসার টাকা দিয়ে। সুজন সখী চলচ্চিত্রের একটি সংলাপ আবছা মনে পড়ছে, সখী তুই আর আমি মিইল্যা নতুন দুনিয়া বানাবো, এমন এক দুনিয়া...যেখানে ছোট ছোট কথা লইয়া কামড়া কামড়ি থাকবো না, হিংসা থাকবো না...বৈঠা ধর সখী।
চিত্রনায়ক ফারুক, আপনি আমাদের সুজন হয়ে বেঁচে থাকবেন দীর্ঘকাল৷




