আদিবাসী নারীদের হাতে তৈরি মহুয়া, এখন আন্তর্জাতিক লাক্সারি ব্র্যান্ড

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ , ১১:১৭ এএম


আদিবাসী নারীদের হাতে তৈরি মহুয়া, এখন আন্তর্জাতিক লাক্সারি ব্র্যান্ড
মহুয়া। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের গভীর জঙ্গলে আদিবাসী নারীদের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পানীয় মহুয়া এখন আর শুধু স্থানীয় বা 'দেশি মদ' হিসেবে পরিচিত নয়। শতাব্দী প্রাচীন এই পানীয় ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক লাক্সারি স্পিরিটসের বাজারে। আদিবাসী সংস্কৃতি, নারীদের শ্রম এবং আধুনিক বিপণনের সমন্বয়ে মহুয়া আজ বিশ্বজুড়ে নতুন পরিচয় পাচ্ছে।

পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের সংখ্যা খুবই কম। তার মধ্যে মহুয়া অন্যতম। কোনো শস্য বা ফল নয়, বরং মহুয়া গাছের ঝরে পড়া ফুল সংগ্রহ করে তা থেকে তৈরি হয় এই বিশেষ পানীয়।

মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও মহারাষ্ট্রসহ ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে মহুয়া গাছ 'জীবনদায়ী গাছ' হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ফুল ঝরার মৌসুমে ভোরের আগে নারী ও শিশুরা জঙ্গলে গিয়ে ফুল সংগ্রহ করেন। ফুল শুকানো, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং পাতন প্রক্রিয়াসহ পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকেন আদিবাসী নারীরা।

তবে মহুয়ার ইতিহাস সবসময় ইতিবাচক ছিল না। ব্রিটিশ শাসনামলে এই পানীয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। স্থানীয় মদের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি মদের ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে মহুয়াকে 'বিপজ্জনক মাদক' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিন গোপনে মহুয়া উৎপাদন চলতে থাকে এবং নিম্নমানের উৎপাদনের কারণে এর সুনামও ক্ষুণ্ন হয়। স্বাধীনতার পরও সরকারি নীতিতে এটি মূলত 'দেশি মদ' হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে।

বর্তমানে মহুয়া প্রধানত দুই ধরনের পদ্ধতিতে তৈরি হয়। সনাতনী পদ্ধতিতে একবার পাতনের মাধ্যমে তৈরি পানীয়তে অ্যালকোহলের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ থাকে এবং এর স্বাদ-গন্ধ বেশ তীব্র। অন্যদিকে আধুনিক ডাবল-ডিস্টিলড মহুয়ায় অ্যালকোহলের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ। এটি দেখতে স্বচ্ছ এবং স্বাদে আন্তর্জাতিক মানের গ্রাপ্পা বা অ্যাগ্রিকোল রামের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

DesmondJi_DJ_All_Products

২০২১ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার মহুয়াকে 'হেরিটেজ লিকার' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হয়। বর্তমানে DesmondJi, Six Brothers Mahura, Mond, Mohulo এবং MAH Spirit-এর মতো প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড দেশ-বিদেশের বাজারে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এর মধ্যে কিছু ব্র্যান্ড যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

Mohulo_-_2nd

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সিঙ্গেল মল্ট হুইস্কি ও জিন যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে, মহুয়াও সেই পথেই এগোচ্ছে। তবে এখনও ছোট আদিবাসী নারী সমবায়গুলোর সামনে বাজার সম্প্রসারণ, সময়মতো অর্থপ্রাপ্তি এবং বিভিন্ন রাজ্যের ভিন্ন আবগারি আইনের মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

তবুও সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে মহুয়া আজ আদিবাসী সমাজের ঐতিহ্য থেকে আন্তর্জাতিক লাক্সারি ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার পথে। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, বরং ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাত্রার এক অনন্য প্রতীক।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission