বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে জনবিরল মহাদেশ। গবেষক ও অভিযাত্রী ছাড়া সেখানে মানুষের কোনো স্থায়ী বসতি নেই। তবে ১৯৮৫ সালে এই বরফাচ্ছন্ন মহাদেশে পাওয়া একটি মানবখুলি ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরেছিল এক বিস্ময়কর রহস্য, যার সমাধান আজও মেলেনি।
১৯৮৫ সালের ৭ জানুয়ারি চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড্যানিয়েল তোরেস নাভারো অ্যান্টার্কটিকার ইয়ামানা সৈকতে গবেষণার সময় বালুর নিচে আংশিক চাপা পড়ে থাকা একটি মানবখুলি খুঁজে পান। খুলিটির পেছনের অংশ বাইরে থাকলেও সামনের অংশ বালুর নিচে চাপা ছিল। উদ্ধার করার পর দেখা যায়, ওপরের চোয়ালের কিছু অংশ ও কয়েকটি দাঁত অক্ষত রয়েছে, তবে নিচের চোয়াল ও সামনের দাঁতগুলো অনুপস্থিত।
পরবর্তী পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, এটি কোনো বয়স্ক ব্যক্তির নয়; বরং একজন তরুণীর খুলি। রেডিওকার্বন ও রাসায়নিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, ওই তরুণীর মৃত্যু হয়েছিল ১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে। অর্থাৎ, অ্যান্টার্কটিকা আনুষ্ঠানিকভাবে আবিষ্কারের সময়কাল বা তারও আগে।

ঐতিহাসিকভাবে ১৮২০ সালে রুশ অভিযাত্রী থাদিউস ভন বেলিংহসেনকে অ্যান্টার্কটিকা দেখার প্রথম নিশ্চিত নথিভুক্ত অভিযাত্রী হিসেবে ধরা হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে তরুণীটি কি তার আগেই অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছেছিলেন?
এই রহস্যের ব্যাখ্যায় গবেষকেরা কয়েকটি সম্ভাব্য তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। একটি মতে, উনিশ শতকের শুরুতে সিল শিকারিদের কোনো অভিযানের সঙ্গে ওই তরুণী অ্যান্টার্কটিকার কাছাকাছি এলাকায় এসেছিলেন এবং কোনো কারণে সেখানে আটকা পড়েন।
আরও গ্রহণযোগ্য আরেকটি তত্ত্ব বলছে, সমুদ্রযাত্রার সময় তরুণীর মৃত্যু হলে সে সময়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাঁর মরদেহ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরে সমুদ্রস্রোত ও ঝড়ের প্রভাবে দেহটি অ্যান্টার্কটিকার উপকূলে এসে পৌঁছায়। সেখানে মৃতদেহভোজী পাখিরা দেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলায় খুলিসহ হাড়গুলো সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
খুলি উদ্ধারের পর একই এলাকায় একাধিকবার অনুসন্ধান চালিয়ে গবেষকেরা একটি ঊরুর হাড়ও উদ্ধার করেন। তাদের ধারণা, দেহের অন্যান্য হাড় এখনো সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
ঘটনার প্রকৃত সত্য আজও অজানা। তরুণীটি জীবিত অবস্থায় অ্যান্টার্কটিকার মাটিতে পা রেখেছিলেন, নাকি মৃত্যুর পর তার দেহ সাগরের স্রোতে ভেসে সেখানে পৌঁছেছিল তার নিশ্চিত উত্তর মেলেনি। তবে এখন পর্যন্ত অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন মানবদেহাবশেষগুলোর অন্যতম হিসেবে এই আবিষ্কার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স
আরটিভি/এসকে



