মেক্সিকো সিটির ব্যস্ততা থেকে অনেক দূরে, জচিমিলকো খালের গভীর অরণ্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় দ্বীপ। নাম ‘পুতুলের দ্বীপ’। বিশ্বের সবচেয়ে ভৌতিক ও রহস্যঘেরা স্থানগুলোর তালিকায় এই দ্বীপের নাম বহুদিন ধরেই রয়েছে। দিনের আলোতেও যেখানে গা ছমছম করে, সেখানে রাত কাটানোর সাহস পান না অনেক পর্যটক।
দ্বীপজুড়ে গাছের ডাল, ঘরের চালা ও বেড়াজুড়ে ঝুলে আছে হাজার হাজার পুরোনো পুতুল। কোনো পুতুলের হাত নেই, কারও চোখ নেই, আবার কোনোটি সময়ের সঙ্গে বিকৃত হয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো দ্বীপ যেন নিথর চোখে তাকিয়ে আছে আগন্তুকদের দিকে।
কীভাবে শুরু হলো এই রহস্য?
প্রায় সাত দশক আগে, উনিশশো পঞ্চাশের দশকে ডন জুলিয়ান সান্তানা বারেরা নামে এক ব্যক্তি পরিবার ছেড়ে এই নির্জন দ্বীপে বসবাস শুরু করেন। জনশ্রুতি রয়েছে, সেখানে আসার কিছুদিন পর তিনি খালের ধারে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি।
এর কিছুদিন পর থেকেই জুলিয়ানের দাবি ছিল, গভীর রাতে তিনি ওই কিশোরীর কান্নার শব্দ শুনতে পান এবং তার আত্মা তাকে অনুসরণ করে। একদিন খালের পানিতে একটি পুতুল ভাসতে দেখে তিনি সেটিকে কিশোরীর স্মৃতি ও আত্মার প্রতীক মনে করেন। এরপর সেই পুতুল গাছে ঝুলিয়ে দেন। তারপর দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি হাজার হাজার পুতুল সংগ্রহ করে পুরো দ্বীপজুড়ে ঝুলিয়ে রাখেন।
কেন এত ভয় পান মানুষ?
দ্বীপে প্রবেশ করলেই চারদিকে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। শত শত নয়, হাজার হাজার বিকৃত পুতুল যেন স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে দর্শনার্থীদের দিকে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অনেক পর্যটকের দাবি, সূর্য ডোবার পর পুতুলগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। তারা ফিসফিস করে কথা বলে, আবার কেউ কেউ দাবি করেন, নৌকা পাশ দিয়ে গেলে পুতুলগুলো হাতছানি দেয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মতো দেখতে কিন্তু প্রাণহীন বস্তুকে ঘিরে যে তীব্র ভয় তৈরি হয়, সেটিই এই দ্বীপে আরও বেশি অনুভূত হয়।
রহস্য আরও গভীর করে জুলিয়ানের মৃত্যু
দীর্ঘ ৫০ বছর এই দ্বীপে কাটানোর পর ২০০১ সালে ডন জুলিয়ানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেখান থেকে বহু বছর আগে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল, ঠিক সেই স্থানেই ভেসে ওঠে জুলিয়ানের মরদেহ।
তার মৃত্যু হৃদ্রোগে হয়েছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য ছিল— সেই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।
এখনও টানে হাজারো পর্যটক
বর্তমানে জুলিয়ানের ভাতিজা এই দ্বীপের দেখভাল করেন। তার দাবি, তার চাচা পাগল ছিলেন না, বরং একটি আত্মাকে শান্ত করার দায়িত্ব পালন করছিলেন।
আজ এই দ্বীপ জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হলেও, অনেক নৌকার মাঝি এখনো সেখানে যেতে চান না। তাদের বিশ্বাস, দ্বীপের পথটি অভিশপ্ত।
যারা সেখানে যান, তারা অনেকেই মৃত কিশোরীর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি ছোট পুতুল গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে আসেন।
রহস্য না বিশ্বাস?
বিশ্বের অনেক অতিপ্রাকৃত ঘটনা অনুসন্ধানকারী এই দ্বীপে রাত কাটিয়ে রহস্যময় শব্দ ও অস্বাভাবিক ছায়া দেখার দাবি করেছেন। তবে এসব ঘটনার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি।
হাজারো ঝুলন্ত পুতুল, নিস্তব্ধ পরিবেশ আর রহস্যময় ইতিহাস— সব মিলিয়ে মেক্সিকোর এই পুতুলের দ্বীপ আজও কৌতূহল, ভয় এবং বিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক। এখানকার প্লাস্টিকের নিথর চোখগুলো আজও যেন অজানা কোনো গল্প শুনিয়ে যায়।
আরটিভি/জেএমএ



