টাকা ধার দিয়ে ফেরত পাচ্ছেন না, আদায়ের কার্যকর উপায় জানালেন বিশেষজ্ঞরা

আরটিভি নিউজ

রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬ , ০১:৫১ পিএম


টাকা ধার দিয়ে ফেরত পাচ্ছেন না, আদায়ের কার্যকর উপায় জানালেন বিশেষজ্ঞরা
ছবি: কৃত্রিম বুুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা

বিশ্বাসের জায়গা থেকেই মানুষ বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মী কিংবা পরিচিত কাউকে টাকা ধার দেন। কিন্তু সেই বিশ্বাসই অনেক সময় বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধার নেওয়ার সময় দ্রুত টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরে নানা অজুহাত, সময়ক্ষেপণ কিংবা যোগাযোগ এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এতে যেমন সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তেমনি কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

আইনজীবী ও আর্থিক পরামর্শকদের মতে, ধারের টাকা আদায়ে শুরুতেই আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে ধাপে ধাপে এগোনোই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা, এরপর প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সবশেষে প্রয়োজন হলে আইনের আশ্রয় নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ।

শান্তভাবে যোগাযোগ করাই প্রথম পদক্ষেপ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় আর্থিক সংকট বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণেও টাকা ফেরত দিতে দেরি হতে পারে। তাই শুরুতেই উত্তেজিত না হয়ে ভদ্রভাবে ফোন, বার্তা বা সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত। আলোচনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমস্যার সমাধান, সম্পর্ক নষ্ট করা নয়।

নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করুন

বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার পরও টাকা ফেরত না পেলে দুই পক্ষের সম্মতিতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত। লিখিতভাবে বা মেসেজের মাধ্যমে সেই সময়সীমা সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমে।

কিস্তিতে টাকা ফেরতের সুযোগ

যদি এককালীন পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব না হয়, তাহলে মাসিক বা সাপ্তাহিক কিস্তিতে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ঋণগ্রহীতার ওপর চাপ কমে এবং পাওনাদারও ধীরে ধীরে নিজের অর্থ ফেরত পান।

প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা

ঋণগ্রহীতা যদি আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হন, তাহলে পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য বা উভয়ের পরিচিত সম্মানিত কাউকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ব্যক্তির মধ্যস্থতায় দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়।

প্রমাণই সবচেয়ে বড় শক্তি

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধারের টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রমাণ। লিখিত চুক্তি না থাকলেও মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, এসএমএস, ই-মেইল কিংবা অডিও বার্তায় টাকা নেওয়ার স্বীকারোক্তি সংরক্ষণ করা উচিত। এছাড়া ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হলে সেই লেনদেনের কাগজপত্রও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

লিখিত চুক্তি ঝুঁকি কমায়

বড় অঙ্কের টাকা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন আইনজীবীরা। চুক্তিতে ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা, পরিশোধের পদ্ধতি এবং নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত না দিলে করণীয় উল্লেখ থাকলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা অনেকটাই কমে যায়।

নিরাপত্তা চেক রাখতে পারেন

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, বড় অঙ্কের টাকা ধার দেওয়ার সময় সমপরিমাণ অর্থের একটি পোস্ট-ডেটেড বা সিকিউরিটি চেক নেওয়া যেতে পারে। নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ না হলে সেই চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করা যায়। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেক প্রত্যাখ্যাত হলে প্রচলিত আইনের আওতায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।

লিগ্যাল নোটিশ হতে পারে কার্যকর

সব ধরনের আলোচনা ব্যর্থ হলে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার আগেই এ ধরনের নোটিশের পর ঋণগ্রহীতা টাকা পরিশোধ করে থাকেন।

শেষ উপায় আদালত

লিগ্যাল নোটিশেও কাজ না হলে পাওনাদার দেওয়ানি আদালতে অর্থ আদায়ের মামলা করতে পারেন। চুক্তিপত্র, ব্যাংক লেনদেন, রসিদ, বার্তা কিংবা অন্যান্য প্রমাণ থাকলে আদালতে দাবি প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলক সহজ হয়।

অন্যদিকে, যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্যে টাকা নেওয়া হয়েছিল, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ফৌজদারি মামলার সুযোগও থাকতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ধার দেওয়ার আগে যেসব সতর্কতা জরুরি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাকা উদ্ধারের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ধার দেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ করা। শুধু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে লিখিত চুক্তি করা, নগদের পরিবর্তে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করা, টাকা গ্রহণের রসিদ সংরক্ষণ, বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে সিকিউরিটি চেক নেওয়া এবং আগেই পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত।

সম্পর্কও থাকুক, টাকাও ফিরুক

ধারের টাকা নিয়ে বিরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক। তাই প্রথমে ধৈর্য, সৌজন্য ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করাই উত্তম। তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করেন বা টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেন, তাহলে নিজের অধিকার রক্ষায় আইনের আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিশ্বাস নয়, লিখিত প্রমাণ ও সঠিক প্রক্রিয়াই ধারের টাকা নিরাপদে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেয়।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission