ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

এত সচেতনতা সত্ত্বেও কেন থামল না আতশবাজি?

মোনছেফা তৃপ্তি

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
মোনছেফা তৃপ্তি। ছবি: ফাইল

প্রতি বছর নতুন বছরের প্রাক্কালে একই দৃশ্য— নিষেধাজ্ঞা, সচেতনতামূলক প্রচারণা, সংবাদ প্রতিবেদন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ; তবু রাত নামলেই ঢাকার আকাশ আলো–শব্দে ফেটে পড়ে। প্রশ্নটা কি শুধু আইন বা ব্যবস্থাপনার, নাকি প্রশ্নটা মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক চালচিত্রের—সে বিষয়ে আমাদের নিজস্ব বোঝাপড়া জরুরি। আমরা অনেকেই আতশবাজির ক্ষতিকর দিক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছি, আবার ঠিক মধ্যরাতেই এই আতশবাজির উন্মাদনায় গা ভাসিয়েছি। আমরা জানি আতশবাজি ক্ষতিকর—তবু করি। এই ‘জানা–করা’র ফাঁকটাই আসলে সমস্যার কেন্দ্রে।

মানুষের আচরণবিজ্ঞানে একে বলা হয় কগনিটিভ ডিসোন্যান্স— মনে বিশ্বাস আর কাজে আচরণের দ্বন্দ্ব। আমরা বিশ্বাস করি পরিবেশ রক্ষা জরুরি, আবার উৎসবের রাতে নিজেকে বলি, ‘একটু হলে কী হয়!’ এই একটু–ই পরে সমষ্টিগত বিপর্যয় হয়। এরসঙ্গে যোগ হয় সামাজিক অনুকরণ। একজন শুরু করলে পাশেরজন থামতে চায় না। আনন্দ যেন ব্যক্তিগত নয়, প্রতিযোগিতামূলক— কে বেশি শব্দ করবে, কে বেশি আলো জ্বালাবে। এই প্রতিযোগিতার ভেতর লুকিয়ে থাকে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক ভয়— আমি বাদ পড়ে যাব না তো? তাই সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও আচরণ বদলায় না।

এখানে আনন্দের একটি বিকৃত ধারণাও কাজ করে। আমাদের সংস্কৃতিতে আনন্দকে নীরব, দায়িত্বশীল বা সংযতভাবে উদযাপনের চর্চা দুর্বল। শব্দ যত বেশি, আনন্দ তত বড়— এই সমীকরণ বহুদিন ধরে মাথায় গেঁথে গেছে। ফলে আইন বা অনুরোধকে মানুষ আনন্দের ‘শত্রু’ ভাবতে শেখে। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে—নিয়ম ভাঙাটাই যেন রোমাঞ্চ।

আমাদের এই নিয়মভাঙ্গা রোমাঞ্চের সরাসরি প্রভাব পড়ে ঢাকার বাতাসে। নতুন বছরের রাতে ঢাকায় অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা হঠাৎ বেড়ে যায়। বিভিন্ন পরিবেশবিষয়ক পর্যবেক্ষণ ও সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই রাতে ঢাকার বায়ুদূষণ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। আতশবাজির ধোঁয়ায় সালফার, নাইট্রেট ও ভারী ধাতুর কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু, বয়স্ক, অ্যাজমা ও হৃদরোগীদের জন্য এই কয়েক ঘণ্টার ‘আনন্দ’ পরিণত হয় কয়েক সপ্তাহের শারীরিক ভোগান্তিতে।

শব্দদূষণও একইভাবে বেড়ে যায়। স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি, যা মানসিক চাপ ও ঘুমের সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।
মানুষের পাশাপাশি সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী হলো পাখি। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্ষবরণের রাতেই ঢাকায় শতাধিক পাখির মৃত্যু হয়েছে। শব্দের তীব্রতায় পাখিরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনেকে উড়ে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে আঘাত পায়, অনেকে ভবনের কাচে ধাক্কা খায়, আবার অনেকে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে চড়ুই, কাক ও শহরে বসবাসকারী ছোট পাখিরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু মৃত্যু নয়— অনেক পাখি তাদের বাসা ছেড়ে এলাকা বদলাতে বাধ্য হয়েছে, যা নগরের জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি।

এই ক্ষতির সঙ্গে যোগ হয় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। প্রতিবছরই দেখা যায়, ফানুস ও আতশবাজি থেকে আগুন লাগার ঘটনা। নতুন বছরের রাত ও পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফানুস থেকে ছাদে বা ঝোপে আগুন লাগার একাধিক ঘটনা ঘটে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বারবার সতর্ক করলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি মানা হয় না। অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও ঝুঁকিটা থেকেই যায়—ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় যা যে কোনো সময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

তাহলে প্রশ্ন— আইন থাকলেও কেন কাজ করে না? কারণ আইন প্রয়োগের দৃশ্যমানতা কম। মানুষ নিয়ম মানে তখনই, যখন নিয়ম ভাঙার পরিণতি চোখে পড়ে। পাশাপাশি রয়েছে বাণিজ্যিক স্বার্থ। উৎসব এলেই আতশবাজির অবৈধ বা অর্ধ-আইনি বাজার সক্রিয় হয়। এই বাজার নিয়ন্ত্রণ না করলে শুধু সচেতনতা দিয়ে পরিস্থিতি বদলানো যায় না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসলে নৈতিক—কার আনন্দ, কার কষ্টের বিনিময়ে? যে শিশু শব্দে কেঁপে ওঠে, যে বয়স্ক মানুষ আতঙ্কে রাত কাটায়, যে অসুস্থ মানুষ নিশ্বাস নিতে লড়াই করে, কিংবা যে পাখি আকাশ থেকে ঝরে পড়ে—তারা আমাদের আনন্দের গল্পে জায়গা পায় না। এই অদৃশ্য মানুষ ও প্রাণীদের আমরা নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারিনি বলেই আমাদের ভেতরে দায়বদ্ধতাও জন্ম নেয় না। যে আনন্দে সবার ভাগ থাকে না, যে আনন্দ কারও জন্য আতঙ্ক, কারও জন্য ক্ষতি আর কারও জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়— তা কীভাবে একজন মানবিক মানুষের আনন্দ হতে পারে? প্রকৃত আনন্দ তো কাউকে বাদ দিয়ে, কাউকে কষ্ট দিয়ে জন্ম নিতে পারে না। নিজের সুখ যদি অন্যের ক্ষতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই সুখে কোনো নৈতিক সৌন্দর্য নেই। প্রকৃতি, প্রাণ ও মানুষের সঙ্গে সহমর্মিতা না থাকলে উৎসবের আলোও অন্ধকার হয়ে ওঠে। সত্যিকারের আনন্দ সেখানে, যেখানে উদযাপন মানে জীবনের প্রতি সম্মান—ধ্বংসের উল্লাস নয়।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা কঠিন হলেও সরল সচেতনতা ছিল, আছে। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দায়বদ্ধতা ও সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ না থাকলে সচেতনতা আচরণে রূপ নেয় না। ঢাকার আকাশে শব্দ ও ধোঁয়া থামাতে হলে, আগে আমাদের মাথার ভেতরের এই ভুল আনন্দের ধারণাটাই বদলাতে হবে। সমাধান তাই একমাত্রিক নয়। প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ, আনন্দের ধারণা বদলানো, নীরব ও পরিবেশবান্ধব উদযাপনকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করা, নিয়মিত ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগ, অবৈধ বাজার বন্ধ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানুষের ভেতরে সহানুভূতির বোধ জাগানো।

পরিবেশ ও মানবিক উপায়ে নতুন বছর উদযাপন করা সম্ভব—যেখানে আনন্দ থাকবে, কিন্তু কোনো প্রাণ বা প্রকৃতির ক্ষতি হবে না। আতশবাজির বদলে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে নীরব আলোর আয়োজন করা যেতে পারে— মোমবাতি, প্রদীপ বা সৌরশক্তিচালিত লাইট ব্যবহার করে। মধ্যরাতে শব্দহীন কাউন্টডাউন, কবিতা পাঠ, গান বা আড্ডা হতে পারে আনন্দের কেন্দ্র। পাড়াভিত্তিকভাবে গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বা দুস্থ মানুষের জন্য খাবার ও শীতবস্ত্র বিতরণ নতুন বছরের প্রথম কাজ হতে পারে। শিশুদের নিয়ে প্রকৃতি–বান্ধব খেলাধুলা, বই পড়া বা চিত্রাঙ্কনের আয়োজন করা যায়। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রার্থনা, ধ্যান ও আত্মসমালোচনার সময় রাখা যেতে পারে—যাতে নতুন বছরটি কেবল উদযাপনের নয়, বরং মানবিক ও দায়িত্বশীল হওয়ার অঙ্গীকারের সূচনা হয়। আনন্দ তখন শব্দে নয়, সহমর্মিতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সচেতনতায় প্রকাশ পাবে—এটাই হতে পারে নতুন বছরের সবচেয়ে সুন্দর উদযাপন।

লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
আরও পড়ুন
মিরপুরে আতশবাজি বিস্ফোরণে দগ্ধ ৪ 
চীনের আতশবাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ২১
ভারতে আতশবাজি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত অন্তত ২০
চীনে আতশবাজির দোকানে বিস্ফোরণ, নিহত ১২