এত সচেতনতা সত্ত্বেও কেন থামল না আতশবাজি?

মোনছেফা তৃপ্তি

বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬ , ০৮:১৩ পিএম


এত সচেতনতা সত্ত্বেও কেন থামল না আতশবাজি?
মোনছেফা তৃপ্তি। ছবি: ফাইল

প্রতি বছর নতুন বছরের প্রাক্কালে একই দৃশ্য— নিষেধাজ্ঞা, সচেতনতামূলক প্রচারণা, সংবাদ প্রতিবেদন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ; তবু রাত নামলেই ঢাকার আকাশ আলো–শব্দে ফেটে পড়ে। প্রশ্নটা কি শুধু আইন বা ব্যবস্থাপনার, নাকি প্রশ্নটা মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক চালচিত্রের—সে বিষয়ে আমাদের নিজস্ব বোঝাপড়া জরুরি। আমরা অনেকেই আতশবাজির ক্ষতিকর দিক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছি, আবার ঠিক মধ্যরাতেই এই আতশবাজির উন্মাদনায় গা ভাসিয়েছি। আমরা জানি আতশবাজি ক্ষতিকর—তবু করি। এই ‘জানা–করা’র ফাঁকটাই আসলে সমস্যার কেন্দ্রে।

বিজ্ঞাপন

মানুষের আচরণবিজ্ঞানে একে বলা হয় কগনিটিভ ডিসোন্যান্স— মনে বিশ্বাস আর কাজে আচরণের দ্বন্দ্ব। আমরা বিশ্বাস করি পরিবেশ রক্ষা জরুরি, আবার উৎসবের রাতে নিজেকে বলি, ‘একটু হলে কী হয়!’ এই একটু–ই পরে সমষ্টিগত বিপর্যয় হয়। এরসঙ্গে যোগ হয় সামাজিক অনুকরণ। একজন শুরু করলে পাশেরজন থামতে চায় না। আনন্দ যেন ব্যক্তিগত নয়, প্রতিযোগিতামূলক— কে বেশি শব্দ করবে, কে বেশি আলো জ্বালাবে। এই প্রতিযোগিতার ভেতর লুকিয়ে থাকে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক ভয়— আমি বাদ পড়ে যাব না তো? তাই সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও আচরণ বদলায় না।

এখানে আনন্দের একটি বিকৃত ধারণাও কাজ করে। আমাদের সংস্কৃতিতে আনন্দকে নীরব, দায়িত্বশীল বা সংযতভাবে উদযাপনের চর্চা দুর্বল। শব্দ যত বেশি, আনন্দ তত বড়— এই সমীকরণ বহুদিন ধরে মাথায় গেঁথে গেছে। ফলে আইন বা অনুরোধকে মানুষ আনন্দের ‘শত্রু’ ভাবতে শেখে। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে—নিয়ম ভাঙাটাই যেন রোমাঞ্চ।

বিজ্ঞাপন

আমাদের এই নিয়মভাঙ্গা রোমাঞ্চের সরাসরি প্রভাব পড়ে ঢাকার বাতাসে। নতুন বছরের রাতে ঢাকায় অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা হঠাৎ বেড়ে যায়। বিভিন্ন পরিবেশবিষয়ক পর্যবেক্ষণ ও সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই রাতে ঢাকার বায়ুদূষণ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। আতশবাজির ধোঁয়ায় সালফার, নাইট্রেট ও ভারী ধাতুর কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু, বয়স্ক, অ্যাজমা ও হৃদরোগীদের জন্য এই কয়েক ঘণ্টার ‘আনন্দ’ পরিণত হয় কয়েক সপ্তাহের শারীরিক ভোগান্তিতে। 

শব্দদূষণও একইভাবে বেড়ে যায়। স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি, যা মানসিক চাপ ও ঘুমের সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।
মানুষের পাশাপাশি সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী হলো পাখি। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্ষবরণের রাতেই ঢাকায় শতাধিক পাখির মৃত্যু হয়েছে। শব্দের তীব্রতায় পাখিরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনেকে উড়ে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে আঘাত পায়, অনেকে ভবনের কাচে ধাক্কা খায়, আবার অনেকে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে চড়ুই, কাক ও শহরে বসবাসকারী ছোট পাখিরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু মৃত্যু নয়— অনেক পাখি তাদের বাসা ছেড়ে এলাকা বদলাতে বাধ্য হয়েছে, যা নগরের জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি।

বিজ্ঞাপন

এই ক্ষতির সঙ্গে যোগ হয় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। প্রতিবছরই দেখা যায়, ফানুস ও আতশবাজি থেকে আগুন লাগার ঘটনা। নতুন বছরের রাত ও পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফানুস থেকে ছাদে বা ঝোপে আগুন লাগার একাধিক ঘটনা ঘটে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বারবার সতর্ক করলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি মানা হয় না। অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও ঝুঁকিটা থেকেই যায়—ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় যা যে কোনো সময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

তাহলে প্রশ্ন— আইন থাকলেও কেন কাজ করে না? কারণ আইন প্রয়োগের দৃশ্যমানতা কম। মানুষ নিয়ম মানে তখনই, যখন নিয়ম ভাঙার পরিণতি চোখে পড়ে। পাশাপাশি রয়েছে বাণিজ্যিক স্বার্থ। উৎসব এলেই আতশবাজির অবৈধ বা অর্ধ-আইনি বাজার সক্রিয় হয়। এই বাজার নিয়ন্ত্রণ না করলে শুধু সচেতনতা দিয়ে পরিস্থিতি বদলানো যায় না।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসলে নৈতিক—কার আনন্দ, কার কষ্টের বিনিময়ে? যে শিশু শব্দে কেঁপে ওঠে, যে বয়স্ক মানুষ আতঙ্কে রাত কাটায়, যে অসুস্থ মানুষ নিশ্বাস নিতে লড়াই করে, কিংবা যে পাখি আকাশ থেকে ঝরে পড়ে—তারা আমাদের আনন্দের গল্পে জায়গা পায় না। এই অদৃশ্য মানুষ ও প্রাণীদের আমরা নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারিনি বলেই আমাদের ভেতরে দায়বদ্ধতাও জন্ম নেয় না। যে আনন্দে সবার ভাগ থাকে না, যে আনন্দ কারও জন্য আতঙ্ক, কারও জন্য ক্ষতি আর কারও জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়— তা কীভাবে একজন মানবিক মানুষের আনন্দ হতে পারে? প্রকৃত আনন্দ তো কাউকে বাদ দিয়ে, কাউকে কষ্ট দিয়ে জন্ম নিতে পারে না। নিজের সুখ যদি অন্যের ক্ষতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই সুখে কোনো নৈতিক সৌন্দর্য নেই। প্রকৃতি, প্রাণ ও মানুষের সঙ্গে সহমর্মিতা না থাকলে উৎসবের আলোও অন্ধকার হয়ে ওঠে। সত্যিকারের আনন্দ সেখানে, যেখানে উদযাপন মানে জীবনের প্রতি সম্মান—ধ্বংসের উল্লাস নয়।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা কঠিন হলেও সরল সচেতনতা ছিল, আছে। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দায়বদ্ধতা ও সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ না থাকলে সচেতনতা আচরণে রূপ নেয় না। ঢাকার আকাশে শব্দ ও ধোঁয়া থামাতে হলে, আগে আমাদের মাথার ভেতরের এই ভুল আনন্দের ধারণাটাই বদলাতে হবে। সমাধান তাই একমাত্রিক নয়। প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ, আনন্দের ধারণা বদলানো, নীরব ও পরিবেশবান্ধব উদযাপনকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করা, নিয়মিত ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগ, অবৈধ বাজার বন্ধ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানুষের ভেতরে সহানুভূতির বোধ জাগানো।

পরিবেশ ও মানবিক উপায়ে নতুন বছর উদযাপন করা সম্ভব—যেখানে আনন্দ থাকবে, কিন্তু কোনো প্রাণ বা প্রকৃতির ক্ষতি হবে না। আতশবাজির বদলে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে নীরব আলোর আয়োজন করা যেতে পারে— মোমবাতি, প্রদীপ বা সৌরশক্তিচালিত লাইট ব্যবহার করে। মধ্যরাতে শব্দহীন কাউন্টডাউন, কবিতা পাঠ, গান বা আড্ডা হতে পারে আনন্দের কেন্দ্র। পাড়াভিত্তিকভাবে গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বা দুস্থ মানুষের জন্য খাবার ও শীতবস্ত্র বিতরণ নতুন বছরের প্রথম কাজ হতে পারে। শিশুদের নিয়ে প্রকৃতি–বান্ধব খেলাধুলা, বই পড়া বা চিত্রাঙ্কনের আয়োজন করা যায়। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রার্থনা, ধ্যান ও আত্মসমালোচনার সময় রাখা যেতে পারে—যাতে নতুন বছরটি কেবল উদযাপনের নয়, বরং মানবিক ও দায়িত্বশীল হওয়ার অঙ্গীকারের সূচনা হয়। আনন্দ তখন শব্দে নয়, সহমর্মিতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সচেতনতায় প্রকাশ পাবে—এটাই হতে পারে নতুন বছরের সবচেয়ে সুন্দর উদযাপন।

লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission