‘তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এক যুগান্তকারী মুহূর্ত- যেখানে ক্ষমতা জনগণের হাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে’

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান 

বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৬:০৮ পিএম


‘তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এক যুগান্তকারী মুহূর্ত- যেখানে ক্ষমতা জনগণের হাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে’
বিএনপি’র তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান। ফাইল ছবি

প্রায় দুই দশক নির্বাসনে থাকার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকে কেবল ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে সময়, পরিস্থিতি এবং গত কয়েক বছরের শাসনব্যবস্থার ক্রমাগত ব্যর্থতার দ্বারা গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত। লন্ডনে তার দীর্ঘ অবস্থান কোনোভাবেই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার সময় ছিল না। বরং এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হয় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে যেতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

এ সময় বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দৃঢ়ীকরণ, যেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ভিন্নমত ক্রমশ সংকুচিত এবং প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে আনুগত্যের কাঠামোয় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, জবাবদিহির প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিরোধী রাজনীতি ক্রমাগতভাবে দমনের মুখে পড়ে। তারেক রহমান তখন দেশের বাইরে ছিলেন, কিন্তু তাকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। বরং তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা উল্টো ফল বয়ে আনে। তার অনুপস্থিতিই তাকে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধিতার প্রতীকে পরিণত করে, প্রভাব কমায়নি।

২০০৮ সাল থেকে তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও দলীয় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকে ছিল ভৌগোলিক নিকটতার কারণে নয়, বরং ধারাবাহিকতার কারণে। দলীয় সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা তার নেতৃত্বেই নির্ধারিত হয়েছে। ডিজিটাল যোগাযোগ ও ভার্চুয়াল সমন্বয়ের মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। দূরত্ব এখানে রাজনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; ছিল কেবল একটি লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞাপন

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সময়ে বিএনপির একটি সুসংহত বিরোধী শক্তি হিসেবে টিকে থাকা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের ফল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে। এই রাজনৈতিক ও মানসিক প্রস্তুতিরই বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে।

বাংলাদেশ এখন আবারও এক পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট। একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে রয়েছে, তবে তার কর্তৃত্ব মূলত প্রশাসনিক, রাজনৈতিক নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থবিরতার পর দিকনির্দেশনা প্রত্যাশী জনগণের কাছে এই সরকার সীমিত আশ্বাসই দিতে পারছে। একই সঙ্গে ‘নতুন রাজনীতি’র নানা বয়ান এখনও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব বা জনআস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই বাস্তবতায় নেতৃত্ব আর স্লোগানের মাধ্যমে নয়, বরং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনপরিচিতির মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। তারেক রহমানের ভূমিকা এখন দলীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত। তিনি আর কেবল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বিবেচিত নন; বরং জাতীয় রাজনীতির বিস্তৃত আলোচনার কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি আবারও দেশের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও নির্বাচনীভাবে সক্ষম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গত দেড় দশকের বড় একটি সময়জুড়ে বাংলাদেশ এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে চলেছে, যেখানে নির্বাচন ছিল আপসকৃত এবং জবাবদিহি ছিল সীমিত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকরণ এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি শাসনব্যবস্থার নিয়মিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। এই পুরো সময়ে বিএনপি ছিল এই কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। আইনি চাপ ও রাজনৈতিক প্রলোভন কোনো কিছুই দলটির অবস্থান বদলাতে পারেনি। আপস না করার এই সিদ্ধান্তই দলের ঐক্য অটুট রেখেছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা জীবিত রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

তবে নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল প্রতিরোধে নয়, বরং দিকনির্দেশনা দেওয়ার সক্ষমতায়। তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব সেই দিকনির্দেশনার একটি প্রয়াস। এতে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার মতো সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই প্রস্তাবগুলো কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দীর্ঘদিন নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার একটি দেশের প্রাতিষ্ঠানিক পুনরুদ্ধারের সুপরিকল্পিত কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই কারণে তারেক রহমানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন শুধু দলের প্রয়োজন মেটায় না; এটি জাতীয় পুনরুজ্জীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার ফিরে আসা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসর পুনরায় উন্মুক্ত করে। প্রত্যাশিত জনসমর্থনকে কেবল দলীয় সমাবেশ হিসেবে না দেখে, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রকাশ হিসেবে বোঝা উচিত।

লক্ষণীয় যে, তারেক রহমানের বক্তব্যে প্রতিশোধের ভাষা অনুপস্থিত। তিনি বরং জোর দেন জবাবদিহি, আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সামাজিক সংহতির ওপর। রাজনৈতিক সহিংসতার শিকারদের ন্যায়বিচার, সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকীকরণ তার অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রয়েছে। তার যুক্তি বাস্তববাদী—একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

জিয়াউর রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ এবং খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে উত্তরাধিকার ও অভিযোজন—দুটোরই প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি জাতীয়তাবাদকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছেন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আলোকে।

বাংলাদেশ যখন বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে, তখন প্রভাবের ভারসাম্যও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে বর্তমান সংকট দ্বারা গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রকাশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রত্যাবর্তন একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে—যেখানে ‘ক্ষমতা’ ধীরে ধীরে ক্ষমতাবানদের হাত থেকে জনগণের হাতে সরে যাচ্ছে।

লেখক: এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আইসিটি বিষয়ক সম্পাদক।

আরটিভি/একে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission