ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

‘এই প্রত্যাবর্তন এক যুগান্তকারী মুহূর্ত- যেখানে ক্ষমতা জনগণের হাতে যাচ্ছে’

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান

প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:০৮ পিএম
বিএনপি’র তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান। ফাইল ছবি

প্রায় দুই দশক নির্বাসনে থাকার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকে কেবল ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে সময়, পরিস্থিতি এবং গত কয়েক বছরের শাসনব্যবস্থার ক্রমাগত ব্যর্থতার দ্বারা গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত। লন্ডনে তার দীর্ঘ অবস্থান কোনোভাবেই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার সময় ছিল না। বরং এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হয় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে যেতে থাকে।

এ সময় বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দৃঢ়ীকরণ, যেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ভিন্নমত ক্রমশ সংকুচিত এবং প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে আনুগত্যের কাঠামোয় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, জবাবদিহির প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিরোধী রাজনীতি ক্রমাগতভাবে দমনের মুখে পড়ে। তারেক রহমান তখন দেশের বাইরে ছিলেন, কিন্তু তাকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। বরং তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা উল্টো ফল বয়ে আনে। তার অনুপস্থিতিই তাকে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধিতার প্রতীকে পরিণত করে, প্রভাব কমায়নি।

২০০৮ সাল থেকে তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও দলীয় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকে ছিল ভৌগোলিক নিকটতার কারণে নয়, বরং ধারাবাহিকতার কারণে। দলীয় সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা তার নেতৃত্বেই নির্ধারিত হয়েছে। ডিজিটাল যোগাযোগ ও ভার্চুয়াল সমন্বয়ের মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। দূরত্ব এখানে রাজনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; ছিল কেবল একটি লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সময়ে বিএনপির একটি সুসংহত বিরোধী শক্তি হিসেবে টিকে থাকা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের ফল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে। এই রাজনৈতিক ও মানসিক প্রস্তুতিরই বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে।

বাংলাদেশ এখন আবারও এক পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট। একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে রয়েছে, তবে তার কর্তৃত্ব মূলত প্রশাসনিক, রাজনৈতিক নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থবিরতার পর দিকনির্দেশনা প্রত্যাশী জনগণের কাছে এই সরকার সীমিত আশ্বাসই দিতে পারছে। একই সঙ্গে ‘নতুন রাজনীতি’র নানা বয়ান এখনও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব বা জনআস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

এই বাস্তবতায় নেতৃত্ব আর স্লোগানের মাধ্যমে নয়, বরং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনপরিচিতির মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। তারেক রহমানের ভূমিকা এখন দলীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত। তিনি আর কেবল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বিবেচিত নন; বরং জাতীয় রাজনীতির বিস্তৃত আলোচনার কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি আবারও দেশের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও নির্বাচনীভাবে সক্ষম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গত দেড় দশকের বড় একটি সময়জুড়ে বাংলাদেশ এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে চলেছে, যেখানে নির্বাচন ছিল আপসকৃত এবং জবাবদিহি ছিল সীমিত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকরণ এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি শাসনব্যবস্থার নিয়মিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। এই পুরো সময়ে বিএনপি ছিল এই কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। আইনি চাপ ও রাজনৈতিক প্রলোভন কোনো কিছুই দলটির অবস্থান বদলাতে পারেনি। আপস না করার এই সিদ্ধান্তই দলের ঐক্য অটুট রেখেছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা জীবিত রেখেছে।

তবে নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল প্রতিরোধে নয়, বরং দিকনির্দেশনা দেওয়ার সক্ষমতায়। তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব সেই দিকনির্দেশনার একটি প্রয়াস। এতে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার মতো সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই প্রস্তাবগুলো কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দীর্ঘদিন নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার একটি দেশের প্রাতিষ্ঠানিক পুনরুদ্ধারের সুপরিকল্পিত কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই কারণে তারেক রহমানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন শুধু দলের প্রয়োজন মেটায় না; এটি জাতীয় পুনরুজ্জীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার ফিরে আসা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসর পুনরায় উন্মুক্ত করে। প্রত্যাশিত জনসমর্থনকে কেবল দলীয় সমাবেশ হিসেবে না দেখে, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রকাশ হিসেবে বোঝা উচিত।

লক্ষণীয় যে, তারেক রহমানের বক্তব্যে প্রতিশোধের ভাষা অনুপস্থিত। তিনি বরং জোর দেন জবাবদিহি, আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সামাজিক সংহতির ওপর। রাজনৈতিক সহিংসতার শিকারদের ন্যায়বিচার, সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকীকরণ তার অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রয়েছে। তার যুক্তি বাস্তববাদী—একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

জিয়াউর রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ এবং খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে উত্তরাধিকার ও অভিযোজন—দুটোরই প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি জাতীয়তাবাদকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছেন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আলোকে।

বাংলাদেশ যখন বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে, তখন প্রভাবের ভারসাম্যও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে বর্তমান সংকট দ্বারা গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রকাশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রত্যাবর্তন একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে—যেখানে ‘ক্ষমতা’ ধীরে ধীরে ক্ষমতাবানদের হাত থেকে জনগণের হাতে সরে যাচ্ছে।

লেখক: এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আইসিটি বিষয়ক সম্পাদক।

আরটিভি/একে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
তারেক রহমান মানসিকভাবে বাংলাদেশেই ছিলেন
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে। দীর্ঘ প্রায় আঠারো বছর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আজ জাতীয় আবেগ, প্রত্যাশা ও আশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একজন রাজনৈতিক নেতার প্রবাসজীবন ও দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে এমন গণজাগরণ ও কৌতূহল বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব কমই দেখা গেছে। দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে তাকে ষড়যন্ত্রমূলক মামলার বেড়াজালে আটকে রেখে দেশের মাটি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— তিনি শারীরিকভাবে বিদেশে অবস্থান করলেও মানসিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে ও আদর্শগতভাবে সবসময়ই ছিলেন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে। তার প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশ, ছিল এ দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার। সাধারণভাবে বলা হয়, নেতার অনুপস্থিতি দলে ভাঙন ধরায়, কর্মীদের মনোবল দুর্বল করে। কিন্তু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। প্রবাসে থেকেও তিনি দলের সাংগঠনিক ঐক্য অটুট রেখেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং কর্মীদের মাঝে সাহস ও আস্থা যুগিয়েছেন। দেশের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তিনি ছিলেন ছায়ার মতো পাশে। ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনোই জনগণের কাছে দূরের মানুষ হয়ে ওঠেননি; বরং হয়ে উঠেছেন এক নীরব প্রেরণার উৎস। দীর্ঘ প্রবাসজীবন তার রাজনৈতিক সক্ষমতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি, বরং তাকে আরও পরিণত ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে। সাধারণত দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলে নেতার সঙ্গে জনগণের একটি মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু তারেক রহমান সেই দূরত্বকে পরিণত করেছেন এক ভিন্নধর্মী নৈকট্যে। তিনি কখনো রাজনীতি থেকে বিরতি নেননি, বরং এই সময়কে কাজে লাগিয়েছেন দেশের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র ও দলীয় কাঠামো নিয়ে গভীর চিন্তা ও পরিকল্পনায়। প্রবাসে থেকেও তিনি তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন, যা তাকে সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের কাছে আরও বেশি আপন করে তুলেছে। ইংল্যান্ডে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে। বাস্তবতা হলো, তার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে ও সংযত। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির সন্তান এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েও তিনি বিলাসিতা বা আড়ম্বরের পথে হাঁটেননি। লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরেও তিনি সাধারণ নাগরিকের মতো জীবন যাপন করেছেন। এই অনাড়ম্বর জীবনবোধই তাকে জনগণের কাছের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ক্ষমতা বা বিত্তের অহংকার থেকে দূরে থেকে তার এই জীবনদর্শন প্রমাণ করে— তার রাজনীতি ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়, বরং একটি কল্যাণমুখী ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বাংলাদেশ দীর্ঘ এক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পথে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী নেতৃত্বে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে তার আগমন নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। আজকের তরুণরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে একটি রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়েছে, তারা তারেক রহমানের মাঝেই তাদের ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা খুঁজে পাচ্ছে। এই তরুণরাই গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে। তাদের এই দীর্ঘ সংগ্রামে সাহস ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান নিজেই। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক চিন্তায় বিশ্বাসী এই প্রজন্ম দেখেছে— কীভাবে একজন নেতা শত প্রতিকূলতার মাঝেও অবিচল থেকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন। তার নেতৃত্ব তরুণদের শিখিয়েছে, ন্যায়ের পথে কখনো পিছপা হতে নেই। তার আগমনে তরুণরা আজ উজ্জীবিত, কারণ তারা বিশ্বাস করে— তারেক রহমানের হাত ধরেই গড়ে উঠবে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে বাকস্বাধীনতা থাকবে, মেধার মূল্যায়ন হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়া হবে। আরও পড়ুন তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন : নতুন রাজনীতির সূচনা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের এই ঘরে ফেরা কেবল একজন ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। যে ষড়যন্ত্র তাকে দীর্ঘদিন দূরে রাখতে চেয়েছিল, তা জনগণের ভালোবাসা ও প্রত্যাশার জোয়ারে ভেঙে পড়েছে। তার দেশপ্রেম, মানসিক দৃঢ়তা, সাদামাটা জীবনযাপন ও তারুণ্যের প্রতি অগাধ আস্থা— সব মিলিয়ে তিনি এক অনন্য নেতৃত্বের প্রতীক। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকতে বাধ্য হওয়া, দূরত্ব ঘুচিয়ে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সক্রিয় থাকা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের দেশে ফিরে আসা— এই পুরো প্রক্রিয়াটি দেশপ্রেমের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। ইতিহাস প্রমাণ করে, জনগণের হৃদয়ে যার আসন নিশ্চিত, কোনো ষড়যন্ত্রই তাকে চিরদিন দূরে রাখতে পারে না। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন আসলে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদারই ফিরে আসা। নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন, তা বাস্তবায়িত হবে— এটাই আজ মানুষের বিশ্বাস। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তার ফিরে আসা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা দিচ্ছে। এই আলোয় অন্ধকার দূর হবে, আর বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের নতুন দিগন্তের দিকে। লেখক: যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক), বিএনপি আরটিভি/এএইচ
তারেক রহমান মানসিকভাবে বাংলাদেশেই ছিলেন
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন : নতুন রাজনীতির সূচনা
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির আকাশে দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে যে শূন্যতা, হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, আজ (বৃহস্পতিবার) তা এক বিশাল প্রত্যাশার আলোকবর্তিকা হয়ে উদিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যাকে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে প্রতিহিংসার রাজনীতি আর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, তিনি আগামী ২৫ ডিসেম্বর বীরের বেশে ফিরছেন তার প্রিয় মাতৃভূমিতে। এই দীর্ঘ প্রবাসজীবন কিংবা নির্বাসন কেবল তার ব্যক্তিগত লড়াই ছিল না, বরং তা ছিল বাংলাদেশের লুণ্ঠিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার এক সুদীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ সংগ্রাম। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারা অন্তরীণ রেখে এবং তারেক রহমানকে ভৌগোলিকভাবে দূরে ঠেলে দিয়ে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার আমলে এদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনাকেই সমূলে উৎপাটন করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম এই যে, সত্য ও ন্যায়কে সাময়িকভাবে অবদমিত রাখা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা বিজয়ী বেশে আত্মপ্রকাশ করে। তারেক রহমানের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিকালে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত বন্ধুর এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। ক্ষমতার লালসায় কিংবা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের নজিরবিহীন ভয়-ভীতিতে দলের বহু নেতাকর্মীকে বিচ্যুত করার অপচেষ্টা হয়েছে বারবার। বিএনপিকে ভেঙে ফেলার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা চলেছে প্রতিটি স্তরে। কিন্তু সেই চরম দুর্দিনেও দলের ঐক্য যে অটুট ছিল এবং কোনো বড় ধরনের ফাটল ধরেনি, সেটির একমাত্র কৃতিত্ব বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুযোগ্য, বিচক্ষণ এবং ধৈর্যশীল নেতৃত্বের। তিনি শুধু নিজের দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখেননি, বরং দেশের গণতন্ত্রকামী অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝেও এক অনন্য ঐক্যের সেতু নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা যে, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও একজন নেতা কেবল ভিডিও কনফারেন্স এবং সাংগঠনিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটি বিশাল রাজনৈতিক জোটকে অভিন্ন লক্ষ্যে স্থির রাখতে পেরেছেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সুতো, যা সকল মতের মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে গেঁথে রেখেছিল। তারেক রহমান ভৌগোলিক দূরত্বকে তুচ্ছ করে নিজের সাংগঠনিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূলের প্রান্তিক কর্মী পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ রক্ষা করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে তিনি প্রতিটি ইউনিয়নে, প্রতিটি গ্রামে সংগঠনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রেখেছেন। ফ্যাসিস্ট শক্তি তাকে দেশের মাটি থেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও জনগণের হৃৎস্পন্দন থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি, বরং দিন দিন তিনি হয়ে উঠেছেন শোষিত মানুষের ভরসাস্থল। বিএনপিকে খণ্ড-বিখণ্ড করার সকল চক্রান্ত তিনি অত্যন্ত দৃঢ় হাতে দমন করেছেন, যা তার সাংগঠনিক পরিপক্বতারই প্রমাণ দেয়। তার এই নেতৃত্ব কেবল বিএনপিকে রক্ষা করেনি, বরং দেশের সামগ্রিক গণতন্ত্রকামী শক্তিকে একটি মেরুদণ্ড প্রদান করেছে। আজ দেশ এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছে। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ যখন স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত হয়ে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছে, এমন এক সন্ধিক্ষণে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে বাঁচার আশার সঞ্চার করেছে। তিনি কেবল একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে ফিরছেন না, বরং তিনি ফিরছেন এক নতুন ও আধুনিক বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ রূপকল্প নিয়ে। তার নির্দেশিত ঐতিহাসিক ‘৩১ দফা’ আজ সারা দেশে এক গণসনদে পরিণত হয়েছে। এই ৩১ দফার মাধ্যমে তিনি দেশের মানুষের সামনে এমন এক রাষ্ট্রের নকশা উপস্থাপন করেছেন, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এবং নাগরিক অধিকার হবে প্রশ্নাতীত। আরও পড়ুন তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ: ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন ও প্রজন্মের অঙ্গীকার এই রূপকল্প কেবল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের এক বৈপ্লবিক পরিকল্পনা। সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের যে স্বপ্ন তারেক রহমান দেখিয়েছেন, তা দেশের তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ— সকলের মধ্যেই উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সরকার গঠন ও দেশ পরিচালনায় তারেক রহমানের মেধা, দূরদর্শিতা এবং আধুনিক চিন্তাধারা এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলেই আজ সর্বস্তরের মানুষ গভীরভাবে বিশ্বাস করে। দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রবাসজীবনে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন কাছ থেকে দেখেছেন, যা তাকে একজন বিশ্বমানের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলেছে। দেশের মানুষ আজ মনে করে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবেই সমৃদ্ধ হবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের মাঠে লড়াই থেকে শুরু করে রাষ্ট্রসংস্কারের প্রতিটি ধাপে তার উপস্থিতি আজ অপরিহার্য। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের সুবাতাস বয়ে আনবে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভেদ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বিপরীতে তিনি এক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমঝোতামূলক রাজনীতির পথ দেখাচ্ছেন। সেই আশাবাদ আজ কোটি কোটি মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রইং রুম পর্যন্ত আজ একটাই আলোচনা— তারেক রহমান ফিরছেন। এই ফেরা মানেই হলো অন্ধকারের অবসান, এই ফেরা মানেই হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সাধারণ মানুষের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশাকে ধারণ করেই তারেক রহমান আজ বাংলাদেশের জাতীয় নেতার আসনে আসীন হয়েছেন। তারেক রহমানের এই ঘরে ফেরা কেবল একজন ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের লুণ্ঠিত মানচিত্রের পুনরুত্থান। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তার এই পদধ্বনি নেতাকর্মীদের মাঝে যেমন নবপ্রাণের জোয়ার এনেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝেও এক গভীর স্বস্তি বয়ে এনেছে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ আজ স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে যে, তারেক রহমানের নেতৃত্বেই কেবল আসন্ন নির্বাচনে এক বিশাল বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব এবং তার স্বপ্নের হাত ধরেই দেশ এক সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং তা এক নতুন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সূর্যোদয়ের শুভ সূচনা। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেখেছিলেন এবং যা বাস্তবায়নে বেগম খালেদা জিয়া আজীবন সংগ্রাম করেছেন, সেই স্বপ্নের পূর্ণতা দিতেই আজ তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন। লেখক: মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন : নতুন রাজনীতির সূচনা
রিকশাচালক সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে?
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একজন রিকশাচালককে ঢাকা-৮ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। খবর প্রকাশ হতেই ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। আমি নিউজটি দেখে ভীষণ অবাক এবং শকড হয়েছি। এনসিপি আসলে কী করছে? অনেকে বলছে এনসিপি কি মির্জা আব্বাসকে অপমান করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নাকি এটা নিছক রাজনৈতিক বোকামি? কেউ মনে করছেন এটি একটি মিডিয়া স্টান্ট। চারপাশে শুধু প্রশ্ন, এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই রাজনৈতিক sharpness বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ, নাকি নিজেদের হাস্যকর অবস্থায় ফেলেছে দলটি? অনেকে আবার ব্যাপক আবেগী হয়ে বলছে ‘গরিব বলে সে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না?’। কিন্তু আসল ইস্যু গরিব-ধনী নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো আবেগের বিষয় নয়, এটা হলো (wisom) জ্ঞান, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র।  একজন মানুষ রিকশা চালান, মাঠে কাজ করেন, ক্রিকেট খেলেন, সিনেমার নায়ক বা গান গাইতে পারেন। কিন্তু রাজনীতিতে আসা বা সংসদ সদস্য হওয়া মানে দেশের নীতি, আইন, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতি দর্শনের ধারণা, অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রশাস্ত্রের গভীর বোঝাপড়া। শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এসব অর্জন হয় না। Plato তার Republic এ রাষ্ট্রকে একটি জাহাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, সাগরে যাত্রা করা জাহাজ যদি দিকনির্দেশনা না বোঝে, আবহাওয়ার ভাষা না জানে, নেভিগেশন না বোঝে, অভিজ্ঞতা নেই এমন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে জাহাজের ভবিষ্যৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে ডুবে যাওয়াই।  Plato বলেছেন, Everybody wants to be the captain, but almost nobody learns the art of navigation. গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও ঠিক একই সমস্যা দেখা দেয়। যদি জনপ্রিয়তা, আবেগ বা ‘ভালোলাগা’ দিয়ে রাষ্ট্রের স্টিয়ারিং দেওয়া হয়, রাষ্ট্রও জাহাজের মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সক্রেটিসও বলেছিলেন ক্ষমতা একটি দক্ষতা, যা শেখা, অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়। আজকের বাংলাদেশে ঠিক এটি ঘটছে। যারা রাষ্ট্র, আইন, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং প্রশাসনের বিষয়ে অজ্ঞ, তারা আবেগ, জনপ্রিয়তা বা ‘গরিব কার্ড’ ব্যবহার করে সংসদে প্রবেশ করছে। এখানে গরিবদের ছোট করার কোনো লক্ষ্য নেই, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। যারা এই রিকশাচালক মনোনয়নের বিরোধে ‘গরিবকে ছোট করা হচ্ছে’ যুক্তি তুলে ধরছে, তারা আসল সমস্যাকে আড়াল করছে। রাষ্ট্র পরিচালনা হলো দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। এটা কোনো আবেগের থিয়েটার নয়।  গত সংসদে আমরা দেখেছি—গায়িকা, নায়িকা, ক্রিকেটার এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাঠানো হয়েছে। ফলাফল ছিল পেশাদারিত্বহীন নীতিনির্ধারণ, বিশৃঙ্খল নীতি এবং দুর্বল নৈতিক অবস্থান। কোনো উন্নয়নশীল রাষ্ট্র এভাবে এগোতে পারে না। আরও পড়ুন মাটির সঙ্গে সম্পর্ক: জাতির আত্মার গল্প নারী কোটাতেও যখন পুরুষরা অশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে inexperienced নারীদের সংসদে বসান, তখন নারী অধিকার ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত নারীর সমস্যার সমাধান হয় না। বাংলা ঠিকমতো পড়তে না পারা, রাজনৈতিক লিটারেসি বা সংসদের কাজের ধারণা না থাকা নারীরা কীভাবে দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারবে? কীভাবে তারা দেশের অর্ধেক জনগণকে, অর্থাৎ নারীদের, যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে?  এভাবে নারী কোটার ব্যবহার নারীর মর্যাদা অবমূল্যায়ন করে। এটি নারীর গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নয়; গণতন্ত্রের নাম ব্যবহার করে নারীকে প্রদর্শনের বিষয় বানিয়ে নারীপ্রতিনিধিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। সর্বোপরি প্রশ্ন হলো, রিকশাচালক সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে কি? সমস্যা পেশা নয়, সমস্যা দক্ষতা। তিনি কি রাষ্ট্রচালনার জ্ঞান রাখেন, আইন, সংবিধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শন বোঝেন, জাতীয় বাজেট, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে পারবেন? দেশের জটিল সংকট মোকাবিলার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?  যদি উত্তর না হয়, তাহলে তাকে সংসদে পাঠানো জনগণের প্রতি অবিচার। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে আবেগ লাগে না, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মস্তিষ্ক লাগে। প্লেটো এর শিপ অফ দ্যা স্টেট অনুযায়ী, ভুল হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব দিলে জাহাজের মতো রাষ্ট্রও ডুবে যায়। লেখক: শিক্ষক ও গবেষক আরটিভি/আইএম
রিকশাচালক সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে?
শিক্ষার হাল-হাকিকত: পরীক্ষার ফলাফলই কি মূল উদ্দেশ্য?
সাম্প্রতিক প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও উদ্বেগ লক্ষ্য করা গিয়েছে। কেউ একে শিক্ষাব্যবস্থার ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন, কেউ বলছেন এটি কেবল একটি গণপরীক্ষার ফলাফল নয়, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অদৃশ্য অন্তর্দাহের বহিঃপ্রকাশ। এই ফলাফল কোনো দুর্ভাগ্য জনিত ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা দর্শন, যান্ত্রিক পরীক্ষা নির্ভরতা ও গুণগত অবক্ষয়ের স্বাভাবিক ফলাফল। তাই জিজ্ঞাস্য কেবল এতটুকু নয় যে, এইচএসসি পরীক্ষায় কারা পাস করল, কারা ফেল করল। বরং এর চেয়েও গভীরভাবে ভাবনার বিষয় হলো: পরীক্ষার ফলাফলই কি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য? পরীক্ষার ফলাফল কেন্দ্রিক সকল প্রচেষ্টা আমাদের শিক্ষার সংস্কৃতির গভীরে প্রথিত ও সাধারণ শিক্ষার ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের মাঝেই এর শেকড় নিহিত আছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে এখন ‘পরীক্ষা’ নামের এক অতিশক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই শিক্ষার মান, ছাত্রের যোগ্যতা, শিক্ষকতার সাফল্য, এমনকি একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাও নির্ধারিত হচ্ছে পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি কোথা থেকে ও কিভাবে এলো? ঊনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ভারতবর্ষে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল, তার উদ্দেশ্য কখনোই রাষ্ট্রের জন্য স্বাধীনচেতা চিন্তাশীল নাগরিক তৈরি করা ছিল না; বরং সেটা ছিল ‘লিখতে-পড়তে জানা’ এমন এক তাবেদার শ্রেণির আমলা বা কেরানীদের তৈরি করা যারা শাসনযন্ত্রের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করবে। টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে তার বিখ্যাত ‘মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’ (১৮৩৫), যা ম্যাকলের মিনিট হিসেবে পরিচিত, যাতে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য ‘এমন একটি শ্রেণি তৈরি করতে হবে যারা হবে রক্তেমাংসে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তাচেতনায় ও মূল্যবোধে ব্রিটিশ’। দুঃখজনক ভাবে আমরা দু’বার স্বাধীনতা অর্জনের পরও শিক্ষাব্যবস্থার সেই উপনিবেশিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেছি। এখনো আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য মানবিক নাগরিক নয়, বরং পরীক্ষায় উচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ‘চাকরিপ্রার্থী’ আমলা কিংবা কেরানী তৈরি করা আর পরীক্ষার ফলাফলই যাদের যোগ্যতার মাপকাঠি। পরীক্ষার ফলাফলের জন্য উচ্ছ্বাসের আড়ালে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দুর্বিসন্দ্বি ও আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না। প্রতি বছরই বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন দেশে যেন এক উৎসবের দিন হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমে বড় শিরোনাম ‘অমুক বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে’, ‘ফলাফল ভালো, পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি’। কিন্তু এ উচ্ছ্বাসের আড়ালে থেকে যায় তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যর্থতার গভীর এক বাস্তবতা। এই ফলাফল আসলে আমাদেরকে কী বলছে? এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ‘ফলাফল বিপর্যয়’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু সংখ্যায় নয়, শিক্ষার গুণগত মানেও আমরা ভয়াবহভাবে পিছিয়ে গিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেও বাস্তবে তারা বিষয়বস্তুর গভীরতা বোঝে না। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, ‘শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে পাস করে, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারে না’। এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই নিজেদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে আত্মবিশ্বাসী নয়। অথচ টিউটরিং, কোচিং, গাইড বই ও মডেল টেস্টের দৌলতে তারা ভালো ফল করছে। ফলে পরীক্ষায় সফলতা এখন বাস্তব জ্ঞানের নয়, বরং কৌশলে নাম্বার অর্জনের বা মুখস্থ বিদ্যার দক্ষতার পরিমাপক। মানুষ হয়ে ওঠার জন্য শেখা আজ হারিয়ে যাচ্ছে নাম্বারের জন্য ‘পড়া’র চাপে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যে, আমরা ‘পড়ালেখা’কে ‘শেখা’ ভেবে বসেছি। ‘পড়ালেখা’ মানে মুখস্থ করে তথ্য, উপাত্ত বা তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি করা; আর ‘শেখা’ মানে সেই অর্জিত জ্ঞানকে নিজের জীবনের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে, বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা লাভ করা। আমরা আজ শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছি কেবল পরীক্ষার উত্তর দেওয়ার ও বেশি নম্বর পাওয়ার কৌশল, কিন্তু শেখাচ্ছি না কিভাবে জীবন, সমাজ ও প্রকৃতির সঙ্গে অর্জিত জ্ঞানের সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। ফলে তারা বইয়ের তথ্য, উপাত্ত কিংবা তত্ত্ব জানে, কিন্তু জীবনে সেসবের প্রয়োগ জানে না। ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অত্যাচারিতের শিক্ষা’ (প্যাডাগোজি অব দ্য অপ্রেসড)-এ বলেছিলেন, ‘যে শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায় না, তা হলো দমনমূলক শিক্ষা’। আমাদের শিক্ষা এখন সেই দমনমূলক প্রথায় বন্দি যেখানে শিক্ষার্থী কেবল তথ্যগ্রহণকারী, চিন্তাশীল সত্তা নয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোভিড-পরবর্তী শিক্ষার পটভূমি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতায় শিক্ষা ব্যবস্থার আশু সংস্কার ও রূপান্তর অত্যাবশ্যক। কোভিড মহামারি বিশ্বজুড়ে শিক্ষার চেহারা পাল্টে দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে শিক্ষার্থীরা বই থেকে নয়, ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জ্ঞান আহরণ করছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারকরা এই পরিবর্তন এখনো উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মনে হচ্ছে। ফলে পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষার কাঠামো এখনো সেই পুরোনো রূপেই চলছে, যেখানে শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবন ও প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাভাবনা কিংবা অভ্যাসের কোনো প্রতিফলন নেই। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শিক্ষার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা উভয়ই। কিন্তু আমরা এখনো তার কোনো সুশৃঙ্খল ব্যবহার বা নৈতিক দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারিনি। শিক্ষার্থীরা চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল ব্যবহার করে অ্যাসাইনমেন্ট করছে, অথচ শেখার প্রক্রিয়া বিশেষ করে বিচার বিশ্লেষণ ও চিন্তাভাবনা থেকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই বিযুক্তিই এখন আমাদের শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, একটি দেশের শিক্ষার মান নির্ভর করে তার শিক্ষকের ওপর। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে একদিকে শিক্ষকরা যেমন নানা দিক থেকে উপেক্ষিত, অন্যদিকে তেমনি শিক্ষকতা পেশা অশিক্ষকদের পদচারণায় মুখর। সমাজের অন্য পেশার তুলনায় বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকেরা নানাভাবে বঞ্চিত। তাদের সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ সবক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার রাজনীতিকিকরণ ও দুর্নীতির ফলে অযোগ্যদের ভারে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। অনেক শিক্ষক মনে করেন, তাদের কাজ কেবল সিলেবাস শেষ করা; শিক্ষার্থীর চিন্তা বা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তাদের দায়িত্ব নয়। ফলে শ্রেণিকক্ষ এখন আলোচনার নয়, বরং বক্তৃতার জায়গা। শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থী শোনে এই একমুখী প্রথাগত পাঠদান পদ্ধতি শিক্ষাকে নিস্তরঙ্গ ও প্রাণহীন করে তুলেছে। আমেরিকান শিক্ষাবিদ জন ডিউইয়ের ভাষায়, ‘শিক্ষা হলো পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রক্রিয়া’, কিন্তু আমাদের শ্রেণিকক্ষে সেই পারস্পরিকতা অনুপস্থিত। নম্বর অর্জনের ও চাকুরির প্রতিযোগিতায় নিজেদেরকে যোগ্য প্রমাণ করতে শিক্ষার্থীদের ওপর আজ অভিভাবক ও সমাজের চাপও ভয়াবহ। একটি শিশু স্কুলে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় ‘ভালো ফল করতে হবে’ নামের প্রত্যাশার এক বিশাল বোঝা। এর ফলে শিশুর মধ্যে শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়, মনের মধ্যে বাসা বাঁধে তীব্র প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার ভয়, উদ্বেগ ও তুলনামূলক হীনমন্যতা। অভিভাবকরা মনে করেন, জিপিএ-৫ মানেই সাফল্য। অথচ তারা ভাবেন না, সন্তান কীভাবে মানুষ হচ্ছে, তার মূল্যবোধ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সে সমাজের প্রতি কতটা সচেতন হচ্ছে। ফলে এই একপেশে সাফল্য চেতনা আমাদের নতুন প্রজন্মকে যান্ত্রিক, প্রতিযোগিতা মুখী এবং আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। আমরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, সে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের নাগরিকদের তৈরি করতে ফলাফল নয়, প্রয়োজন শিক্ষার পুনর্গঠন ও যুগোপযোগী রূপান্তর। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের এইচএসসি ফলাফল আসলে এক প্রকার ‘সতর্কবার্তা’। যদি আমরা এখনই আমাদের শিক্ষার ভিত্তিকে পুনর্গঠন না করি, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় আসবে। শিক্ষার উদ্দেশ্যকে কেবল ‘পরীক্ষা পাস’ বা ‘চাকরি পাওয়া’র গণ্ডি থেকে বের করে এনে মানুষ গড়ার সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। এজন্য দরকার একটি নতুন শিক্ষা দর্শন, প্রাসঙ্গিক শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক সুতোয় গাঁথা থাকবে। শিক্ষাব্যবস্থার জীবনমুখী যুগোপযোগী রূপান্তরে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে:  ১. বস্তুগত শিক্ষার সাথে মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার সংযোজন ঘটাতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষা কেবল তথ্যের সঞ্চয় বৃদ্ধি নয়; এটি মানুষ হিসেবে আমাদের চরিত্র গঠন ও চেতনার বিকাশ সাধন করে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, শিক্ষা এমন এক প্রক্রিয়া যা মানুষকে ‘আপনার সঙ্গে নিজের পরিচয় করায়’। তাই শিক্ষার প্রতিটি স্তরে নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের পাঠ পুনঃপ্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এটি শিক্ষার্থীদের আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে এনে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। ২. শিক্ষার্থীদের শিখনফলের ক্রমাগত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাবর্ষের শেষে একটি মাত্র পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর পুরো বছরের যোগ্যতা নির্ধারণ করা অন্যায্য ও অযৌক্তিক। শিক্ষার উদ্দেশ্য শেখার ধারাবাহিকতার মাধ্যমে আত্মোন্নয়ন ও আত্মবিকাশ, যা এককালীন পরীক্ষায় প্রতিফলিত হয় না। তাই শিক্ষাবর্ষের শেষে কেবল পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং বছরজুড়ে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, সৃজনশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার নানা কার্যকলাপকে মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে শেখা হবে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ভিত্তিক আত্মোন্নয়ন প্রচেষ্টা, পরীক্ষার ফলাফল নির্ভর নয়। আরও পড়ুন ১০ মাসে দেশে ঢুকেছে আরও ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪০ রোহিঙ্গা ৩. শিক্ষকদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ ও তাঁদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন, তিনি সমাজের আলোকবর্তিকাও বটে। অথচ আমাদের বাস্তবতায় শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ, সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার ঘাটতিতে ভোগেন। তাদেরকে প্রদত্ত বেতন-ভাতা অন্যান্য পেশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের গবেষণা নির্ভর, প্রযুক্তি-বান্ধব ও সৃজনশীল শিক্ষাদানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষককে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। ৪. জীবনমুখী যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। আমাদের পাঠ্যক্রম এখনো পরীক্ষামুখী এবং বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে যাতে শ্রেণিকক্ষের জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য হয়। বিজ্ঞান, সাহিত্য বা ইতিহাস সব ক্ষেত্রেই শেখার উদ্দেশ্য হবে আগামী প্রজন্মকে মানবিক করে গড়ে তোলা ও তাদেরকে সমাজ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করা। শিক্ষা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা জীবনের জন্য, কেবল পরীক্ষার জন্য নয়। ৫. প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল টুল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ভয় নয়, সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তবে এ ব্যবহারের মধ্যে থাকতে হবে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। শিক্ষার্থীরা যেন প্রযুক্তির দাস না হয়ে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মানবিক জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে এমন কাঠামো তৈরি করা জরুরি। ৬. অভিভাবকদের ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের মানসিকতা। আমাদের অভিভাবকরা সন্তানদের শিক্ষা মানে বোঝেন ‘চাকরি পাওয়া’র উপায়। এই ধারণা বদলাতে হবে এবং শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ‘মানুষ হওয়া’ এই উপলব্ধি তৈরি করতে হবে।। শিক্ষা আসলে মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়া, যেখানে সাফল্যের মাপকাঠি হলো নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ। পরিবার ও সমাজ যদি এই মূল্যবোধের পুনর্গঠন না করে, তবে শিক্ষার যেকোনো সংস্কারই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও লক্ষ্যের সাথে সামন্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষার দর্শনকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদরা তাই সর্বদাই বলে এসেছেন, শিক্ষা হলো জীবনবোধের অনুশীলন। কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘শিক্ষা মানুষকে নিজের ভুল চিনতে শেখায়’। প্রকৃত অর্থে শিক্ষা কোনো পাত্রে তথ্য ঢালা নয়; বরং মননের আগুন প্রজ্বলিত করা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ হয়ে ওঠার সেই আগুন এখন নিভে আসছে। আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল তথ্য, উপাত্ত কিংবা তত্ত্ব ঢালছি, কিন্তু তাদের মধ্যে চিন্তার আগুন জ্বালাতে পারছি না। বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে আমাদেরকে নতুন সম্ভাবনার ডাক দিতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ হওয়াটা স্বাভাবিক; তবে এটিকে আমরা কেবল হতাশার প্রতীক হিসেবে দেখলে ভুল করব। আমাদের জন্য এটি এক গভীর আত্মসমালোচনার সুযোগও এনে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে আমাদের নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করার: আমরা কেমন শিক্ষার্থী চাই? কেবল পরীক্ষায় পাস করা মানুষ, নাকি মানবিক বোধসম্পন্ন নাগরিক? আমরা কেমন শিক্ষক চাই? কেবল সিলেবাস শেষ করা কর্মচারী, নাকি চিন্তা উসকে দেওয়া দার্শনিক? আমরা কেমন সমাজ চাই? কেবল ডিগ্রিধারী কর্মজীবী, নাকি ন্যায় ও সত্যের চর্চায় বিশ্বাসী মানুষ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষার দিকনির্দেশ। কারণ শিক্ষা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপকরণ নয় এটি মানবমুক্তির প্রক্রিয়াও বটে। এবারে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল হয়তো আপাতদৃষ্টিতে ‘বিপর্যয়’ মনে হচ্ছে, কিন্তু তা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার এক সুযোগও বটে। এটা ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দেব কোথা’ এই আক্ষেপ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাব্যবস্থাকে জীবনমুখী যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিশেষ আহ্বান। এখন সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার ও নতুন করে ঢেলে সাজাবার যেখানে শেখা মানে জীবন তথ্য, উপাত্ত বা তত্ত্বের বোঝা নয়, কেবল নাম্বারের জিপিএ নয়, সাথে সাথে জীবনের অর্থ খোঁজাও। আমাদের শিক্ষার মানের উৎকর্ষ সাধন করতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরের মধ্যমে যেখানে শিক্ষক মানে অনুপ্রেরণা, আর শিক্ষার্থী মানে অনুসন্ধানী মন। পরীক্ষার ফলাফল নয়, জীবনের স্বরূপ অনুসন্ধানই হবে তখন আমাদের শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। নতুন স্বপ্নের জাল বুনে আমরা সেই সুদিনের প্রতীক্ষায় রইলাম।  লেখক- ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
শিক্ষার হাল-হাকিকত: পরীক্ষার ফলাফলই কি মূল উদ্দেশ্য?
সবার আগে খবর ছাপানোর উন্মাদনায় হারিয়ে যাচ্ছে সত্য
বর্তমান যুগে, যেখানে খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং অ্যালগরিদম নির্ধারিত শিরোনামই মানুষের নজর কাড়ে, সহানুভূতি যেন সংবাদকক্ষ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে। স্বীকার করতে হবে, এখন অনেকেই এই খেলার অংশ হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বলিউডের কিংবদন্তি ধর্মেন্দ্র গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালীন, সোশ্যাল মিডিয়া টাইমলাইন ও টেলিভিশন টিকারগুলোতে একটাই খবর ছড়িয়েছে- মৃত্যুর ভুয়া রিপোর্ট। আজ সকালে তার কন্যা এবং অভিনেত্রী এশা দেওল সাংবাদিক ও নেটিজেনদের অনুরোধ করেছেন, প্রিয়জনের মৃত্যুর বিষয়ে অবিশ্বস্ত খবর ছড়ানো বন্ধ করতে। এর আগের রাতে, ধর্মেন্দ্রর প্রথম বিবাহ থেকে সন্তান এবং অভিনেতা সানি দেওলের টিমও জনসমাজে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিল। এবার, ধর্মেন্দ্রর স্ত্রী ও সহ-অভিনেত্রী হেমা মালিনীও তার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ লিখেছেন, যা ঘটছে তা ক্ষমাযোগ্য নয়। একজন মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং সুস্থতার পথে রয়েছেন, এমন অবস্থায় কিভাবে দায়িত্বশীল চ্যানেল ভুয়া খবর ছড়াতে পারে? এটি পরিবারের প্রতি চরম অমর্যাদাকর। বছরের শুরুতেই, ধর্মেন্দ্র অল্প সময় হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন একই ধরনের গুজব ছড়িয়েছিল, যা পরে খারিজ করা হয়। এই চক্রটি পূর্বানুমেয়- হোয়াটসঅ্যাপে নকল শ্রদ্ধা, অবিশ্বস্ত টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে খবর, কয়েকটি ‘সূত্রের খবর’ শিরোনাম এবং হঠাৎ করেই - একটি পুরো দেশ এমন কিছু নিয়ে শোক প্রকাশ করছে যা ঘটেনি। সংবাদকর্মীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সেলিব্রিটির মৃত্যু সংবাদ প্রস্তুত রাখা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রস্তুতি এবং শিকার করার মধ্যে সূক্ষ্ম সীমারেখা আছে। মিডিয়া কোথায় সেই সীমারেখা অতিক্রম করেছে, সেখানে সেলিব্রিটির অসুস্থতাকে ‘ট্রেন্ডিং বিষয়’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, ডিজিটাল চরমদর্শন হিসেবে। এটি শুধু ভারতীয় মিডিয়ার সমস্যা নয়, এটি আমাদের সবার সমস্যা। হলিউড অভিনেতা ম্যাথু পেরির মৃত্যুর সময় গসিপ মিডিয়ার অনুমানমূলক রিপোর্টের উদাহরণ স্মরণ করুন। হুইটনি হিউস্টনের শেষ মুহূর্তগুলি সরাসরি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিথ লেজারের মৃত্যু নিয়ে ট্যাবলয়েডে অসংখ্য গুজব তৈরি হয়েছে। ক্রমশ, সহানুভূতি চলে গেছে, এবং প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ‘প্রথম হওয়ার’ লোভে। আরও পড়ুন মাটির সঙ্গে সম্পর্ক: জাতির আত্মার গল্প ধর্মেন্দ্র এখনও জীবিত- তিনি লড়াই করছেন, আরোগ্য লাভ করছেন এবং পরিবারে ঘিরে রয়েছেন। কিন্তু ক্লিক এবং দর্শকসংখ্যার তাগিদে আমরা কি মানবিকতার ইচ্ছা হারিয়েছি? কি আমরা ভুলে গেছি, প্রতিটি ব্রেকিং নিউজের পিছনে পরিবার রয়েছে যারা আতঙ্কিত চেহারায় ফোনে দেখছে তাদের প্রিয়জনের নামের আগে রেস্ট ইন পিস লেখা? (লেখক: মাঞ্জুসা রাধাকৃষ্ণান- বিনোদন, লাইফস্টাইল এবং স্পোর্টস এডিটর। তার এ লেখাটি গালফ নিউজ থেকে অনুবাদ) আরটিভি/কেআই
সবার আগে খবর ছাপানোর উন্মাদনায় হারিয়ে যাচ্ছে সত্য
আরও পড়ুন
তারেক রহমানকে মোদির চিঠি
নিউজটি প্রত্যাহার করা হয়েছে
তারেক রহমানের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাসানের মৃত্যুতে তারেক রহমানের শোক