ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

দেশের ভাগ্য নিয়ে খেলায় পুরনো শকুনেরা কি আবার সক্রিয়?

জিয়া আহমদ

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
প্রতীকী ছবি

গত ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের পর বিএনপি সরকার গঠন করে। দীর্ঘ ২০ বছর পর একটি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল যে নবনির্বাচিত সরকার শান্তিপূর্ণভাবে দেশ পরিচালনার মাধ্যমে গত ২০ বছরে সংঘটিত নানা অনিয়ম দূর করতে পারবে এবং দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের যে অবিরাম সংগ্রাম, তা অন্তত কিছুটা হলেও অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ দেশের এবং দেশের মানুষের! নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের একদিনের মধ্যেই বিরোধী রাজনৈতিক নেতাসহ তাদের কর্মীরা এই সরকারকে উৎখাতের হুমকি দেওয়া শুরু করে; ঠিক যেমনভাবে আজ থেকে ৩৫ বছর আগে, ১৯৯১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে তিনি সরকারকে একদিনও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। শেখ হাসিনা তার কথা রেখেছিলেন। তিনি বিএনপি সরকারের পাঁচ বছরে ১৭৩ দিন হরতাল, হাজার হাজার গাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছেড়েছিলেন। সে সময়ের নবীন রাজনৈতিক দল— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অধিকাংশ নেতার সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে তারা অনেক কিছু মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আজ কিন্তু পরিস্থিতি আর সেরকম নেই।

Untitled-2
জিয়া আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

বস্তুত, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এমনভাবে বিভাজিত করে ফেলেছিলেন যে এখানে রাজনৈতিক বিরোধী মানেই শত্রু হিসেবে বিবেচিত হতো। সে কারণে দেশের রাজনৈতিক কর্মীরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও তাদের রাজনৈতিক পছন্দ গোপন রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। আর বাস্তবে রাজনীতির বিলুপ্তি ঘটিয়ে কোনো স্বীকৃত পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে নির্মূল করে ফেলার কারণে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সে কারণেই সরকারি চাকরিতে ‘কোটা ব্যবস্থার’ সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের গড়ে ওঠা আন্দোলনে শহীদ আবু সাইদ, ওয়াসিম আকরাম ও মীর মুগ্ধের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। এর আগে ২০১৬ ও ২০১৮ সালের ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ এবং সরকারি চাকরিতে কোটা-বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠলেও তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে পারেনি। বস্তুত, ঢাকা শহরের ‘এলিট’ শ্রেণির আন্দোলন কখনোই দেশের আপামর জনগণের সমর্থন পায়নি—বাংলাদেশের অতীতের আন্দোলনের ইতিহাস তাই বলে। ২০২৪-এর আন্দোলনের সময় শহীদ আবু সাইদের আত্মদান সারা দেশের মানুষকে এমনভাবে আলোড়িত করেছিল যে, এরপর আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। দেশের সাধারণ মানুষ যখন ঘর থেকে বের হয়েছে, তখন তারা শেখ হাসিনার পতন ঘটানোর পরই ঘরে ফিরে গেছে।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে—Success has many fathers, failure is an orphan! আমাদের ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর এর নানা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও সম্মুখযোদ্ধা বের হয়ে এলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই মানুষগুলোর আন্দোলনে অংশগ্রহণের কোনো চিহ্ন সে সময়ে তোলা বা প্রচারিত ছবি কিংবা ভিডিওতে পাওয়া যায় না। সেই সময়ের ছবিগুলোতে যাদের দেখা যায়, তারা অভ্যুত্থান শেষে তাদের কাজে বা পড়াশোনায় ফিরে গেছে। গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে যারা ছিলেন—অর্থাৎ কোটা-বিরোধী আন্দোলনের সংগঠকরা—তারা নানা পুলিশি হয়রানির কারণে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেননি। তবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ডাক ও দিকনির্দেশনা তাদের কাছ থেকেই এসেছে—এ কথা অনস্বীকার্য।

গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর সামনের সারির কিছু যুবক সংগঠিতভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে। তারা সচিবালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি অফিস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় অবৈধ আয়ের উৎস হিসেবে। একটি গ্রুপ নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ নাম দিয়ে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু জুলাই ২০২৪-এ কোনো যুদ্ধ হয়নি; হয়েছিল একটি গণ-অভ্যুত্থান। মূলত ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমান্তরালে দাঁড় করানোর অপচেষ্টার ফল এই ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামকরণ। সে সময় সুবিধাভোগীরা সরকারে টিকে থাকার জন্য শহীদ ও আহতদের তালিকা তৈরি করে ভাতা প্রদান শুরু করে—স্বাধীনতা যুদ্ধের অনুকরণে। পরবর্তীতে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত অনেকেই ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ফলে একাধিকবার তালিকা সংশোধন করতে হয়েছে। কিন্তু কাজটি দ্রুততার সঙ্গে এবং যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ছাড়া করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

বর্তমানে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও জুলাই অভ্যুত্থান স্বাধীনতা যুদ্ধের সমতুল্য নয়—এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই অনেকেই একমত। দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তথাকথিত জুলাই যোদ্ধা ও ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আয়ের পথ সংকুচিত হয়েছে, যা তারা মেনে নিতে পারছে না। তাই শুরু হয়েছে নতুন ষড়যন্ত্র।

আওয়ামী লীগের গত সাড়ে সতেরো বছরের শাসনামলের আগে যে তিনটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে দেশে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে রাজনীতির একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই দুই দলের ছত্রছায়ায় রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষমতালিপ্সার কারণে সেই স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ে। তার শাসনামলে দমন-পীড়নের কারণে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলোর প্রস্তুতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি আশানুরূপ ফল লাভ করলেও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো তারা এত বেশি আসন পায়।

এই প্রেক্ষাপটে কিছু গোষ্ঠী দেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রথমত, তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। তৃতীয়ত, সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা চলছে। চতুর্থত, ধর্মীয় বিষয়কে উস্কে দিয়ে সমাজে উগ্রতা ছড়ানোর অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট বাহিনী’ ব্যবহার করে অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অপতৎপরতা শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। এই ধরনের সংগঠিত প্রচারণার পেছনে অর্থের উৎস খুঁজে বের করা জরুরি।

বাংলাদেশের মানুষ বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সরকারের কাজের সমালোচনা অবশ্যই থাকা উচিত—কিন্তু তা হতে হবে তথ্যভিত্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ। মিথ্যা প্রচার ও চরিত্রহনন কোনোভাবেই বাকস্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। একই সঙ্গে সরকারের উচিত অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা পরিহার করে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

দেশের জনগণ যেমন সুশাসন চায়, তেমনি একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকারও প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপপ্রচার যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে তা সরকারের দুর্বলতা হিসেবে প্রতীয়মান হবে। আর রাজনীতিতে জনমতের ধারণা বা ‘পার্সেপশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

গণতন্ত্র ও সুশাসনের বিরোধিতাকারী এই কুচক্রী শক্তিকে প্রতিহত করা না গেলে দেশ আবারও অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হতে পারে। তাই এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি।

লেখক: জিয়া আহমদ, নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
আরও পড়ুন
আমি যাকে ভোট দিই, সেই জেতে: মিষ্টি জান্নাত
ভোট দিলেন মামুনুল হক
বিরল প্রজাতির হিমালয়ান গৃধিনী শকুন উদ্ধার
জাতীয় সংসদ নির্বাচন: প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ চলছে