গত ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের পর বিএনপি সরকার গঠন করে। দীর্ঘ ২০ বছর পর একটি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল যে নবনির্বাচিত সরকার শান্তিপূর্ণভাবে দেশ পরিচালনার মাধ্যমে গত ২০ বছরে সংঘটিত নানা অনিয়ম দূর করতে পারবে এবং দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের যে অবিরাম সংগ্রাম, তা অন্তত কিছুটা হলেও অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ দেশের এবং দেশের মানুষের! নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের একদিনের মধ্যেই বিরোধী রাজনৈতিক নেতাসহ তাদের কর্মীরা এই সরকারকে উৎখাতের হুমকি দেওয়া শুরু করে; ঠিক যেমনভাবে আজ থেকে ৩৫ বছর আগে, ১৯৯১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে তিনি সরকারকে একদিনও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। শেখ হাসিনা তার কথা রেখেছিলেন। তিনি বিএনপি সরকারের পাঁচ বছরে ১৭৩ দিন হরতাল, হাজার হাজার গাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছেড়েছিলেন। সে সময়ের নবীন রাজনৈতিক দল— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অধিকাংশ নেতার সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে তারা অনেক কিছু মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আজ কিন্তু পরিস্থিতি আর সেরকম নেই।
বস্তুত, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এমনভাবে বিভাজিত করে ফেলেছিলেন যে এখানে রাজনৈতিক বিরোধী মানেই শত্রু হিসেবে বিবেচিত হতো। সে কারণে দেশের রাজনৈতিক কর্মীরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও তাদের রাজনৈতিক পছন্দ গোপন রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। আর বাস্তবে রাজনীতির বিলুপ্তি ঘটিয়ে কোনো স্বীকৃত পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে নির্মূল করে ফেলার কারণে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সে কারণেই সরকারি চাকরিতে ‘কোটা ব্যবস্থার’ সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের গড়ে ওঠা আন্দোলনে শহীদ আবু সাইদ, ওয়াসিম আকরাম ও মীর মুগ্ধের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। এর আগে ২০১৬ ও ২০১৮ সালের ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ এবং সরকারি চাকরিতে কোটা-বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠলেও তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে পারেনি। বস্তুত, ঢাকা শহরের ‘এলিট’ শ্রেণির আন্দোলন কখনোই দেশের আপামর জনগণের সমর্থন পায়নি—বাংলাদেশের অতীতের আন্দোলনের ইতিহাস তাই বলে। ২০২৪-এর আন্দোলনের সময় শহীদ আবু সাইদের আত্মদান সারা দেশের মানুষকে এমনভাবে আলোড়িত করেছিল যে, এরপর আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। দেশের সাধারণ মানুষ যখন ঘর থেকে বের হয়েছে, তখন তারা শেখ হাসিনার পতন ঘটানোর পরই ঘরে ফিরে গেছে।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে—Success has many fathers, failure is an orphan! আমাদের ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর এর নানা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও সম্মুখযোদ্ধা বের হয়ে এলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই মানুষগুলোর আন্দোলনে অংশগ্রহণের কোনো চিহ্ন সে সময়ে তোলা বা প্রচারিত ছবি কিংবা ভিডিওতে পাওয়া যায় না। সেই সময়ের ছবিগুলোতে যাদের দেখা যায়, তারা অভ্যুত্থান শেষে তাদের কাজে বা পড়াশোনায় ফিরে গেছে। গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে যারা ছিলেন—অর্থাৎ কোটা-বিরোধী আন্দোলনের সংগঠকরা—তারা নানা পুলিশি হয়রানির কারণে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেননি। তবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ডাক ও দিকনির্দেশনা তাদের কাছ থেকেই এসেছে—এ কথা অনস্বীকার্য।
গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর সামনের সারির কিছু যুবক সংগঠিতভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে। তারা সচিবালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি অফিস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় অবৈধ আয়ের উৎস হিসেবে। একটি গ্রুপ নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ নাম দিয়ে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু জুলাই ২০২৪-এ কোনো যুদ্ধ হয়নি; হয়েছিল একটি গণ-অভ্যুত্থান। মূলত ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমান্তরালে দাঁড় করানোর অপচেষ্টার ফল এই ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামকরণ। সে সময় সুবিধাভোগীরা সরকারে টিকে থাকার জন্য শহীদ ও আহতদের তালিকা তৈরি করে ভাতা প্রদান শুরু করে—স্বাধীনতা যুদ্ধের অনুকরণে। পরবর্তীতে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত অনেকেই ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ফলে একাধিকবার তালিকা সংশোধন করতে হয়েছে। কিন্তু কাজটি দ্রুততার সঙ্গে এবং যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ছাড়া করা হয়েছিল।
বর্তমানে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও জুলাই অভ্যুত্থান স্বাধীনতা যুদ্ধের সমতুল্য নয়—এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই অনেকেই একমত। দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তথাকথিত জুলাই যোদ্ধা ও ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আয়ের পথ সংকুচিত হয়েছে, যা তারা মেনে নিতে পারছে না। তাই শুরু হয়েছে নতুন ষড়যন্ত্র।
আওয়ামী লীগের গত সাড়ে সতেরো বছরের শাসনামলের আগে যে তিনটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে দেশে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে রাজনীতির একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই দুই দলের ছত্রছায়ায় রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষমতালিপ্সার কারণে সেই স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ে। তার শাসনামলে দমন-পীড়নের কারণে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলোর প্রস্তুতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি আশানুরূপ ফল লাভ করলেও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো তারা এত বেশি আসন পায়।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু গোষ্ঠী দেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রথমত, তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। তৃতীয়ত, সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা চলছে। চতুর্থত, ধর্মীয় বিষয়কে উস্কে দিয়ে সমাজে উগ্রতা ছড়ানোর অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট বাহিনী’ ব্যবহার করে অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অপতৎপরতা শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। এই ধরনের সংগঠিত প্রচারণার পেছনে অর্থের উৎস খুঁজে বের করা জরুরি।
বাংলাদেশের মানুষ বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সরকারের কাজের সমালোচনা অবশ্যই থাকা উচিত—কিন্তু তা হতে হবে তথ্যভিত্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ। মিথ্যা প্রচার ও চরিত্রহনন কোনোভাবেই বাকস্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। একই সঙ্গে সরকারের উচিত অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা পরিহার করে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
দেশের জনগণ যেমন সুশাসন চায়, তেমনি একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকারও প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপপ্রচার যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে তা সরকারের দুর্বলতা হিসেবে প্রতীয়মান হবে। আর রাজনীতিতে জনমতের ধারণা বা ‘পার্সেপশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
গণতন্ত্র ও সুশাসনের বিরোধিতাকারী এই কুচক্রী শক্তিকে প্রতিহত করা না গেলে দেশ আবারও অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হতে পারে। তাই এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি।
লেখক: জিয়া আহমদ, নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক
আরটিভি/এমএইচজে



