মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দি শৈশব ও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ভবিষ্যৎ

আখতার জাহান সাথী

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ , ০৮:২১ পিএম


মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দি শৈশব ও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ভবিষ্যৎ
আখতার জাহান সাথী। ছবি: সংগৃহীত

​বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সবচেয়ে আলোচিত ও সম্ভাবনাময় বিষয় হচ্ছে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি অংশ যখন ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সসীমার মধ্যে অর্থাৎ কর্মক্ষম থাকে, তখন সেই বিশেষ অবস্থাকেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। 

হাজার বছরে একটি জাতির জীবনে এমন সুবর্ণ সুযোগ সাধারণত একবারই আসে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক সুযোগের সময়সীমা ২০১৮ সালে শুরু হয়েছে এবং তা বহাল থাকবে ২০৪০ সাল পর্যন্ত। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেসকল দেশ এই অবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারা আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরোপুরি ভেঙে পড়া অর্থনীতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো জাপান। তারা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ‘অর্থনৈতিক মিরাকেল’ হিসেবে বিশ্বে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। এর মধ্যে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১১ কোটি ৭ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। ইউএনডিপির মতে, আগামী ২০৩০ সালে এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ হবে ১৩ কোটি ৬০ লাখ।

​গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তার বিষয় হলো, আজকে ২০২৬ সালে যে শিশুটি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করলো, ২০৪০ সালে তার বয়স হবে ১৯ কিংবা ২০ বছর। সুতরাং, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পেতে এই শিশুটিকে কেন্দ্র করেই আমাদের যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায় হলো বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সম্প্রতি বাংলাদেশের ২১টি জেলার ১ হাজার ৮০৩ জন স্কুল শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। 

গবেষণার তথ্যমতে, দেশের ৬৭ দশমিক ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী কার্টুন বা ভিডিও দেখার জন্য এবং ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মোবাইলে গেম খেলায় আসক্ত। এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো- ২৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী একদমই বাইরে খেলাধূলা করে না এবং বাংলাদেশি শিশুরা প্রতিদিন গড়ে ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছে। দৈনিক ২ ঘণ্টার বেশি অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে শিশুরা মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকিতে পড়ছে। এদের মধ্যে ৫১ দশমিক ১১ শতাংশ ঘুমের সমস্যায়, ৪৫ দশমিক ২৬ শতাংশ মাথা ব্যথায়, ৪৫ দশমিক ৫১ শতাংশ দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় এবং ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ বিষন্নতায় ভুগছে। 

এর ফলে সাইবার অপরাধে জড়ানো, অহেতুক অনীহা, নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা হ্রাস এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা কমে যাওয়ার মতো বড় বড় সামাজিক সমস্যা আমাদের সামনে আসছে—যা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল প্রাপ্তির পথে অন্যতম প্রধান বাধা।

​এই সংকট থেকে উত্তরণে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উভয়কে এক সুতায় বাঁধার জন্য প্রয়োজন সৃজনশীল, উদ্ভাবনী এবং বাস্তবনির্ভর শিক্ষণ কৌশল, যার মূল ভিত তৈরি হতে হবে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। একটি শিশুর ৩ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত মস্তিষ্ক বিকশিত হওয়ার প্রাকৃতিক ছন্দ অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোকে আনন্দমুখর করে তুলতে হবে। যেমন ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব বিষয়ে আগ্রহী হয়, তাই এই সময়ে নীতিশিক্ষার গল্প, ছবিভিত্তিক আলোচনা ও দলগত কার্যক্রমের মাধ্যমে স্কুলকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ তৈরির আঁতুড়ঘর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আবার ৬ থেকে ৮ বছর বয়সে শিশুরা যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করতে ও সামাজিকীকরণ শেখে, তাই খেলাধূলা, গ্রুপস্টাডি ও শিক্ষা সহায়ক প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করে স্কুলকে সৃজনশীলতা বিকাশের কেন্দ্রস্থল বানাতে হবে। 

অন্যদিকে ৯ থেকে ১২ বছর বয়সে শিশুদের মাঝে আত্মনির্ভরশীলতা ও পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ার মনোভাব তৈরি হয়, তাই প্রজেক্ট তৈরি ও মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের উদ্ভাবনী বিকাশের প্রারম্ভিক অনুপ্রেরণা দিতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক এবং সহমর্মিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহী হবে এবং স্ক্রিনে অযথা সময় দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।

​শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননশীলতা বিকাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। শিশুরা স্বভাবগত কারণেই অনুকরণপ্রিয় এবং পিতামাতার মনোযোগ প্রত্যাশী। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b)-এর গবেষণা বলছে, অভিভাবকদের দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাসই মূলত শিশুদের স্ক্রিন নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে অভিভাবকদের সাথে সন্তানদের আবেগীয় সংযোগ হ্রাস পাচ্ছে, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে এবং শিশুদের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয়, আচরণগত ত্রুটি ও সামাজিক দক্ষতার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। 

এই সংকট উত্তরণে অভিভাবকদের সন্তানের সাথে নিবিড় ও কোয়ালিটি সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং তার ভাবনার বিষয়ে সক্রিয় আগ্রহ দেখিয়ে মানসিক বিকাশে সহযোগিতা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকের সাথে নিয়মিত সমন্বয় করে সন্তানের দুর্বলতা, ঘাটতি এবং তার উদ্ভাবনী চিন্তা বা সম্ভাবনার বিষয় সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা জরুরি। ​এক্ষেত্রে আমরা একটি বৈশ্বিক মডেল বা চীনের শিক্ষা সংস্কার নীতি থেকে শিক্ষা নিতে পারি। চীন ১৯৮০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা কাজে লাগিয়ে আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। 

২০২১ সালে চীন "শুয়াংজিয়ান" (Shuangjian) বা "ডাবল রিডাকশন নীতি" নামে একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা সংস্কার নীতি চালু করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের স্কুলের বাইরে আলাদা করে হোমওয়ার্ক এবং কোচিংয়ের চাপ কমিয়ে আনন্দময় ও ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা। এই নীতির অধীনে চীনের প্রতিটি স্কুলে বিভিন্ন ক্লাব, শিল্পকলা, খেলাধূলা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনার পরিবর্তে শ্রেণীকক্ষে পাজল, কুইজ ও আকর্ষণীয় অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে গেম ভিত্তিক লিখন বা পাঠদান জনপ্রিয় করা হয়েছে। প্রতিদিনের পাঠ্যসূচিতে শারীরিক শিক্ষার সময় বাড়ানোর পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্মার্টবোর্ড, প্রজেক্টর ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।

​উপসংহারে বলা যায়, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আমাদের হাতে সময় কিন্তু খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই বিশাল জনসম্পদকে যদি আমরা সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারি, তবে এর উল্টো ও ভয়াবহ পরিণাম আমাদেরকেই বহন করতে হবে। তাই ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনশক্তি নির্মাণে, স্ক্রিনে আসক্ত সন্তানদের আনন্দমুখর পরিবেশে সৃজনশীল ও মেধা বিকাশ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জড়িত করতে হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে হতে হবে উদ্ভাবনী নির্ভর, বাস্তবমুখী এবং অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষণ কৌশলে মনোযোগী। একই সাথে সামাজিকীকরণ ও মূল্যবোধ চর্চায় অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। তবেই এক আত্মপ্রত্যয়ী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা আত্মোন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের প্রকৃত সুফল। আমরা আমাদের সেই উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময়ী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন দেখি।

লেখক: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), মান্দা, নওগাঁ।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission