বিরূপ আবহাওয়া ও অতিরিক্ত গরমের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডায়রিয়ার প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। শিশু ও নারীরাও এ রোগ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা না পেলে ডায়রিয়া মারাত্মক রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা ও যত্ন। কারণ বড়দের তুলনায় শিশুদের শরীরে কোষের বাইরের পানি বা এক্সট্রা সেলুলার ফ্লুইড বেশি থাকে। ফলে ডায়রিয়া হলে তারা খুব দ্রুত পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়। আর পানিশূন্যতা তীব্র আকার ধারণ করলে শিশু অজ্ঞান হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
গরমকালে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। প্রতিবার পাতলা পায়খানার সংগে শরীর থেকে প্রচুর পরিমানে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। তা যথাযথভাবে পূরণ করা না হলে, রোগীর পানিশূন্যতা, লবনশূন্যতা এমনকি রক্তচাপ কমে গিয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে, মৃত্যুও হতে পারে।
স্যালাইন কতটুকু খাবেন!
স্যালাইন কতটুকু খেতে হবে তা নির্ভর করবে কতবার পাতলা পায়খানা হচ্ছে বা কতটুকু পানি হারাচ্ছেন তার ওপর। ডায়রিয়ার কারণে একজন মানুষ মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এক থেকে দেড় লিটারের বেশি পানি হারাতে পারেন। সহজ কথা হলো, প্রতিবার পায়খানা হওয়ার পর স্যালাইন খাওয়া এবং অল্প করে সারা দিন বারবার খাওয়া। এর বাইরে সারাদিন পানি ও তরল খাবার যেমন-স্যুপ, ডাবের পানি ইত্যাদি খেতে হবে।
অনেক সময় ফুড পয়জনিংয়ের কারণে বমি বা পাতলা পায়খানা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ খাওয়া ঠিক হবে না, কারণ পয়জনিংয়ের ক্ষেত্রে বরং কিছু সময় বমি ও পাতলা পায়খানার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ পয়জন বের হয়ে যায়।
ডায়রিয়া শুরু হলে আধা লিটার বিশুদ্ধ পানিতে এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন ভালোভাবে মিশিয়ে রোগীকে খাওয়াতে হবে। বয়স দুই বছরের নিচে হলে তাদের প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ১০ থেকে ২০ চা চামচ, দুই বছরের বেশী বয়সীদের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৪০ চা চামচ করে যতবার পাতলা পায়খানা হবে ততবারই খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। বানানো খাবার স্যালাইন ৬ (ছয়) ঘন্টা পর্যন্ত খাওয়ানো যায়। এরপর প্রয়োজন হলে আবার নতুন করে খাবার স্যালাইন বানাতে হবে। শিশুর ডায়রিয়া হলে খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি মায়ের বুকের দুধ বেশী করে খাওয়াতে হবে। এছাড়া বড়দের স্বাভাবিক সবধরণের খাবার খাওয়াতে হবে। তবে তরল জাতীয় খাবার বেশী করে খাওয়াতে হবে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ভাতের মাড়, ডাবের পানি, চিড়ার পানি, লবন-গুড়ের শরবত, খাবার স্যালাইন, বিশুদ্ধ পানি খাওয়াতে হবে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীদের জন্য পৃথক ইউনিট খোলা হয়েছে। সেখানে রোগীদের বিশেষভাবে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, হাত না ধুয়ে কোনো কিছু খেলে অথবা বাসি, পঁচা খাবার খেলেও ডায়রিয়া হতে পারে। অনেকেই ওয়াসার সরবরাহকৃত লাইনের পানি পান করেন। পানির মাধ্যমে ডায়রিয়ার জীবাণু বেশী ছড়ায়। তাই পানি ফুটিয়ে পান করা সবচেয়ে বেশী নিরাপদ। আবার কেউ কেউ রাস্তাঘাটে খোলা খাবার এবং শরবত খেয়েও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। বারবার পাতলা পায়খানা হলে, বমি হলে, ঝুঁকি না নিয়ে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে রোগীকে ভর্তি হতে হবে।
ডায়রিয়া একটি সাধারণ রোগ হলেও অবহেলার নয়। বর্তমানে ডায়রিয়া বা কলেরায় মৃত্যুর হার অনেক কম। কিন্তু এ রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়।
তাই ডায়রিয়া প্রতিরোধে অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি পান এবং টাটকা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করতে হবে। পঁচা, বাসি কিংবা বাজারের খোলা খাবার এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের প্রতি রাখতে হবে বাড়তি যত্ন ও সতর্কতা। গরমের এ সময়ে তাদের আঁটসাঁট পোশাকের পরিবর্তে ঢিলেঢালা ও সুতির পোশাক পরানো বেশি আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যসম্মত। সবসময় মনে রাখা উচিত ‘প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়’।
আরটিভি/কেডি




