রক্তে বিষাক্ত সীসা নিয়ে বড় হচ্ছে শিশুরা: কমে যাচ্ছে আইকিউ

আরটিভি নিউজ

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ , ১০:৩১ এএম


রক্তে বিষাক্ত সীসা নিয়ে বড় হচ্ছে শিশুরা: কমে যাচ্ছে আইকিউ
গ্রামবাসীদের সাথে সিসার বিষক্রিয়া নিয়ে কথা বলছেন একজন নারী : ছবি সংগৃহীত

সিসা দূষণ আমাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করছে। অনেকদিন ধরে এ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলছে। ফলে একটি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। সদ্য এক গবেষণায় শিশুদের শরীরে উচ্চমাত্রায় সিসা শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ বা আইসিডিডিআর,বির একটি গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫০০ শিশুর মধ্যে ৯৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা নিরাপদসীমার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।

২০১২ সাল থেকে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৫৪ থেকে ৭৮ শতাংশের রক্তে সীসার উচ্চ উপস্থিতি রয়েছে। সে সময় মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি সীসা থাকাকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।

২০২০ সালে ইউনিসেফ বিশ্বজুড়ে সীসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় বাংলাদেশকে বিশ্বের চতুর্থ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আন্তর্জাতিক এই রেঙ্কিং-এর পরও দেশে কোনো জাতীয় রক্ত পরীক্ষা কর্মসূচি চালু হয়নি। দায়ী শিল্পগুলোর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। 

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘পিওর আর্থ’-এর অর্থায়নে এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে সীসা দূষণজনিত কারণে স্বাস্থ্য খাতের মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমতুল্য। শৈশবে সীসা দূষণের কারণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ কমে যাওয়ার ফলে কর্মজীবনে যে উৎপাদনশীলতা নষ্ট হয়, তার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার।

আরও পড়ুন

২০১২ সাল থেকে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৫৪ থেকে ৭৮ শতাংশের রক্তে সীসার উচ্চ উপস্থিতি রয়েছে। সে সময় মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি সীসা থাকাকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।

গাজীপুরের শিল্প এলাকা টঙ্গীতে ২০০৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষাকৃত ১০৫ জন শিশুর মধ্যে ১০৪ জনের রক্তেই সীসার মাত্রা ছিল ১০ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি—যা শিশুর স্পষ্ট আচরণগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার ক্ষতি করার জন্য দায়ী।

ঢাকার ৭৭৯ জন স্কুলগামী শিশুর ওপর করা আলাদা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ছিল ১০ মাইক্রোগ্রামের বেশি, যার মধ্যে অর্ধেক শিশুর রক্তে এই মাত্রা ছিল ১৫ মাইক্রোগ্রামের ওপরে।

সাম্প্রতিক তথ্যগুলো এই আশঙ্কাজনক চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। 

আইসিডিডিআর,বি-র ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ২ থেকে ৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতিটি শিশুর রক্তেই সীসার ক্ষতিকর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শনাক্তের হার শতভাগ।

আইসিডিডিআর,বি-র সহকারী বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. জেসমিন সুলতানা জানান, ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তেই সীসার মাত্রা সিডিসি-র নির্ধারিত নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে, যেখানে রক্তে সীসার গড় মাত্রা ছিল লিটার প্রতি ৬৭ মাইক্রোগ্রাম।

যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৩ শতাংশের কম শিশুর রক্তে সীসার উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেই তুলনায় বাংলাদেশে সীসার ক্ষতিকর প্রভাব এবং এর মাত্রা অবিশ্বাস্য রকম বেশি।

বাংলাদেশে সীসা দূষণের কথা উঠলেই সাধারণত ১৯৯৯ সালের কথা স্মরণ করা হয়, যখন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সীসাযুক্ত পেট্রোল নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এরপর থেকে সীসা দূষণের প্রধান উৎসগুলো ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হলেও আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি সেই গতিতে বাড়েনি।

বর্তমানে বাংলাদেশে সীসা দূষণের প্রধান উৎস হলো ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং করা। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম বা নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এসব ব্যাটারি ভেঙে সীসা গলানো হয়। ফলে আশপাশের মাটি ও বাতাসে সীসা ছড়িয়ে পড়ে এবং শিশুরা বিষাক্ত ধুলোবালি ও মাটির সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়।

ঢাকার ইসলামবাগ এবং কামরাঙ্গীরচর এই দূষণের অন্যতম হটস্পট।

আরও পড়ুন

আইসিডিডিআর,বি-র এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ইউনিটের প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের সাম্প্রতিক ঢাকা গবেষণায় দেখা গেছে যে সীসা-সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোই শিশুদের মধ্যে এই বিষ ছড়ানোর প্রধান উৎস। আমরা মনে করি সীসা-সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোই সবচেয়ে জরুরি উৎস যা অবিলম্বে বন্ধ বা সমাধান করা প্রয়োজন।

এছাড়া সীসা দিয়ে ঝালাই করা টিনের ক্যান (বিশেষ করে টিনজাত মাছ ও কনডেন্সড মিল্ক), ১৯৯৯ সালের আগের সীসাযুক্ত পেট্রোলের কারণে রাস্তার ধারের মাটির স্থায়ী দূষণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের সিরামিক কারখানা, ওষুধ শিল্প এবং সিমেন্ট কারখানার নির্গমনও এই দূষণের জন্য দায়ী। 

শিশুর মস্তিষ্কে সীসার স্থায়ী ক্ষতি

শরীরে প্রবেশ করার পর সীসা ক্যালসিয়ামের মতো আচরণ করে, যার ফলে এটি শিশুর প্রাথমিক স্নায়বিক বিকাশে বাধা দেয়। এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত করে মনোযোগের অভাব, আবেগ নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং আচরণগত পরিবর্তন ঘটায়।

মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি সীসার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা মানুষের আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। শৈশবে এই ক্ষতি হলে তা আর কখনো নিরাময় করা সম্ভব হয় না। 

চিকিৎসকদের মতে, শিশুর রক্তে সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। রক্তে সীসার উচ্চ মাত্রা সরাসরি শিশুর আইকিউ কমিয়ে দেয় এবং বড় হয়ে তাদের মধ্যে আক্রমণাত্মক ও সমাজবিরোধী আচরণের জন্ম দেয়।

আইসিডিডিআর,বি-র গবেষক ডা. রহমান এবং ডা. সুলতানা বলেন, বাংলাদেশি শিশুরা ইতোমধ্যে এই ক্ষতির শিকার হচ্ছে এবং এটি সরাসরি ক্ষতি করছে। 

২০১৯ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং আইসিডিডিআর,বি-র যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের রক্তে সীসা ছড়ানোর মূল কারণ ছিল রান্নায় ব্যবহৃত গুঁড়ো হলুদ। হলুদের রঙ আকর্ষণীয় করতে এবং ওজন বাড়াতে প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় 'লেড ক্রোমেট' নামের একটি উজ্জ্বল হলুদ পিগমেন্ট মেশানো হতো, যা অত্যন্ত বিষাক্ত।

এই গবেষণা প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে মাত্র দুই বছরের মধ্যে হলুদে সিসার ভেজাল দেওয়ার হার ৪৭ শতাংশ থেকে কমে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। বিশ্বজুড়ে এই আকারের সীসা দূষণ সম্পূর্ণ দূর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশই একমাত্র সফল দেশ।

১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশের আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিক্রিয়া একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। রক্তে সীসা পরীক্ষার জন্য কোনো জাতীয় স্ক্রিনিং কর্মসূচি নেই। অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ ইউএলএবি রিসাইক্লিং খাতটি নামমাত্র তদারকির মধ্যে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য কোনো মাটি শোধন কার্যক্রম নেই এবং সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শিশুদের নিয়মিত সাধারণ চিকিৎসার অংশ হিসেবে রক্তে সীসা পরীক্ষার বিষয়টি এখনও যুক্ত করা হয়নি।

আরও পড়ুন

আইসিডিডিআর,বি-র গবেষকরা বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন, যার জন্য অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং খাতটি পেট্রোল ও হলুদ থেকে সীসা দূর করার মতো সমন্বিত পদক্ষেপের বাইরে থেকে গেছে। 

এ বিষয়ে ডা. রহমান বলেন, অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, বিদ্যমান নিরাপদ রিসাইক্লিং নীতিগুলোর দুর্বল প্রয়োগ, সীসা শিল্পের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বিনিয়োগে উচ্চ মুনাফা, লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের (তিন চাকার গাড়ি) কারণে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির ব্যাপক চাহিদা এবং সবশেষে নিরাপদ বিকল্পে বিনিয়োগের অভাবই এর জন্য দায়ী।

ভারত বাংলাদেশের এক বছর পর ২০০০ সালে সীসাযুক্ত পেট্রোল নিষিদ্ধ করলেও পরবর্তীতে তারা পেট্রোল-পরবর্তী অন্যান্য সীসা দূষণের উৎসের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সক্রিয় আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সীসা দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে ব্যয় ও সুফলের অনুপাত প্রায় ১৭:১ (অর্থাৎ ১ টাকা বিনিয়োগ করলে ১৭ টাকার সুফল মেলে)। বাংলাদেশ যেখানে বর্তমানে প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি নীরবে সহ্য করছে, সেখানে এই ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে বিনিয়োগ করছে অত্যন্ত নগণ্য।

ড. ফাহমিদা খানম জানিয়েছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয় করতে পরিবেশ সচিবের সভাপতিত্বে একটি বহুপাক্ষিক স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস), বিএসটিআই, খাদ্য প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে প্রয়োজনীয় তহবিলের জন্য আবেদন করা হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, বিশেষ করে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি এবং কিছু ঔষধি বা ভেষজ পণ্যের ক্ষেত্রে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission