দীর্ঘদিনের আলোচনার পর অবশেষে এক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। সেইসঙ্গে দ্বিপক্ষীয় একটি নিরাপত্তা চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে দুই দেশের মধ্যে।
ওয়াশিংটনের দাবি, সৌদির সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি একদিকে যেমন জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে, তেমনি অন্যদিকে আরও গভীর হবে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক। ইতোমধ্যে সৌদির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে অভিহিত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
আর বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের পারমাণবিক শক্তি বিস্তারের পথ বানিয়ে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে তৈরি করতে যাচ্ছে নতুন সমীকরণ।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) আলজাজিরা ও বিবিসির পৃথক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানায়, ১৯৫৪ সালের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের সেকশন ১২৩-এর আওতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলো সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। এর পাশাপাশি দুই দেশ একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিতেও সই করেছে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কপি এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা না হলেও কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌথ গবেষণার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তিতে নির্মিত একটি স্থাপনায় পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ পাবে দেশটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সহায়তার নজির তৈরি হবে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, এই চুক্তি পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ মান বজায় রেখেই করা হয়েছে। বিশ্বের সেরা মার্কিন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানীদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এই সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে ইসরায়েলের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি সৌদি আরবের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, যদি চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি থাকে, তবে সেটি হবে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কখনও কোনো দেশকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেয়নি।
তার মতে, কোনো দেশ নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
এর আগে, সৌদি আরবের সঙ্গে এমন চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। তবে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর দাবি, এবার সেই শর্তটি আর রাখা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীনও সৌদি আরবের সঙ্গে একই ধরনের পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল। ফলে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থে ওয়াশিংটন এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি।
সৌদি আরবের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে এই চুক্তিকে। যদিও এর পূর্ণ প্রভাব দৃশ্যমান হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
আরটিভি/এসএইচএম




